বাংলাদশে বেশ কয়েকজন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রয়েছেন তাদের মধ্যে আত্মজীবনী লেখার প্রবণতা কম। হয়তো সময়ের অভাবে লিখতে পারেন না। কিন্তু সারা বিশ্বে অনেক বিখ্যাত শিল্পী রয়েছেন যারা কিছু না কিছু লিখে গেছেন পরবর্তী প্রজেন্মর জন্য। তবে সৌভাগ্যের ব্যাপার কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমান হাতে বেশ সময় নিয়ে সাড়ে ৪৫০ পৃষ্ঠার আত্মজীবনী লিখেছেন। আর সম্প্রতি তা বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে অবশ্য সৈয়দ আব্দুল হাদী এ ধরনের তার আত্মজীবনী লিখেছেন।
আজ থেকে ৩৫ বছর আগে এ দেশের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক শিল্পী ফেরদৌসী রহমানকে বলেছিলেন, তার কথা ও তার আব্বা বিখ্যাত শিল্পী আব্বাস উদ্দীন সম্পর্কে লেখার জন্য। সে সময় শিল্পী ফেরদৌসী রহমান জবাব দিয়েছিলেন, আমি তো লেখক নই। আমি তো গান গাই। যাই হোক দীর্ঘদিন পর হলেও সৈয়দ শামসুল হকের কথা রাখলেন কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমান।
শিল্পী অনেক আগে থেকে মনে মনে লালন করেছিলেন তিনি আত্মজীবনী লিখবেন। শুধু তাই সে সময়কার পরিবেশ পরিস্থিতি সমাজ নিয়ে লিখবেন। এই আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে প্রথমে তিনি একটু হোঁচট খেয়েছিলেন। আর তা হলো, তিনি ক্যাসেটে জবানবন্দির মতো বলে যাবেন। ক্যাসেট তা ধারণ করবে। তারপর হয়তো শুনে শুনে লেখা হবে। কিন্তু বিপত্তি ঘটল। একসময় ক্যাসেটের ফিতা নষ্ট হয়ে গেল। সেই ক্যাসেট থেকে শুনে শুনে যে আত্মজীবনী লিখবেন তা আর হলো না।
দিন ঘুরে এলো। কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের ছেলে রাজিন ও ছেলের বউ সাদিয়া তাদের মমতাময়ী মা-কে একটি দামি ডায়েরি ও কলম দিলেন। দেওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল, মা যেন এই ডায়েরিতে তার আত্মজীবনী লেখেন। অবশেষে লেখা শুরু হলো।
আত্মজীবনী লেখার সময় নিয়ে কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমানকে গত ২১ জুলাই টেলিফোনে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই আত্মজীবনী লিখতে কত সময় লেগেছে। শিল্পী অকপটে বললেন, লেখা তো এক নাগাড়ে হয়নি। যখনই সময় পেয়েছি তখনই লিখতে বসেছি। তবে মাঝেমধ্যে আমার অসুস্থতার কারণে বইটি প্রকাশ করতে বেশ দেরি হয়ে গেল।
বিখ্যাত শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের পরিবারের একজন ভাগ্যবতী ফেরদৌসী রহমান অজস্র গান গেয়েছেন। যা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু তার বেশ কয়েকটি গান এখন আর শোনা যায় না। এর মধ্যে রয়েছে আমি সাগরের নীল/ মধুময় পৃথিবীকে নীল আকাশ ডাকবে/ ভ্রমরের পাখনা যত দূরে যাক না ফুলের দেশে/ তারার দেশে রানী আমি মধুপূর্ণিমা/ আমি সাগরের নীল।
এমনকি সেই হারানো দিন ছবির বিখ্যাত গান ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি/ এই যে নিঝুম রাত ওই মায়াবী চাঁদ ইত্যাদি। ফেরদৌসী রহমান ও তার ভাই মোস্তফা জামান আব্বাসী দ্বৈতকণ্ঠে প্রথমে আসিয়া ছবিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। এরপর সুভাষ দত্তের সুতরাং ছবিতে, চাঁদ বাকা জানি নদী বাঁকা জানি কণ্ঠ দেন। গানগুলো সে সময় শ্রোতা মনে আন্দোলিত করে। একই সঙ্গে জনপ্রিয়তাও পায়।
এসব পুরোনো দিনের গান কেন শোনা যায় না? এই প্রশ্নে ফেরদৌসী রহমান জানান, আমি তো বলতে পারব না। তবে হ্যাঁ আধুনিক গানগুলো ছিল রেডিওর। আমার কাছে বেশ কিছু গান আছে। গানগুলো কেন এই প্রজন্মের শিল্পীরা গায় না? অন্য এই প্রশ্নে শিল্পী ফেরদৌসী রহমান বলেন, আসলে গানগুলো কঠিন। হয়তো সে কারণে গেতে চায় না। আজকাল নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা চটুল গান গাইতে ভালোবাসেন। তবে সব শিল্পীর কথা বলব না।
ফেরদৌসী রহমান পাঁচ দশকের বেশি সময়ে ধরে চলা শুধু গান গেয়ে ক্ষান্ত হননি। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিশুদের অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’তে নিয়মিত শিশুদের গান শিখিয়েছেন। আবার গান শেখানো ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সংযোজন করেন।
এখন তার লেখা আত্মজীবনী বইয়ের পাতায় পাতায় যেন স্মৃতিচারণা। তাতে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের শিল্পী শ্রোতাদের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছু রয়েছে। বইয়ের পাতায় কত অজানারে জানান দেয় কণ্ঠশিল্পী। তিনি অজস্র দেশ-বিদেশের বিখ্যাত শিল্পী, ওস্তাদের সামনে গান গেয়েছেন। শুধু তাই নয় বিখ্যাত ওস্তাদের সান্নিধ্যও পেয়েছেন।
ঢাকা টেলিভিশনে গাওয়া ফেরদৌসী রহমানে প্রথম সেই গান ‘ওই যে আকাশ নীল হলো আজ সে শুধু তোমার প্রেমের জন্য’। চীন থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে সেই ভাষায় গান গাওয়ার সৌভাগ্যের কথা লেখা হয়েছে এই বইয়ে। অথচ তিনি যে দেশ-বিদেশে অজস্র পুরস্কার খেতাব পেয়েছেন তা উচ্চারণ করেননি।
ফেরদৗসী রহমানের বইয়ের শিরোনাম, ‘লোকে বলে প্রেম আর আমি বলি জ্বালা’। গানটি শিল্পীর গাওয়া হলেও এর আগে শিল্পী আনোয়ার উদ্দিন খান গেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে ফেরদৌসী রহমান অকপটে স্বীকার করে বলেন, সুর তারই করা। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে তিনি গানটি সুর করেছিলেন। তবে গানটি পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয়তা পায় যে কারণে বইয়ের নামকরণ অনেক ভেবেচিন্তে করা হয়েছে।
সময়ের আলো/আরবিএন