পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ছড়াল মেডিকেল বর্জ্য, দূষিত লেমুঝিড়ির পানি

বান্দরবান প্রতিনিধি

সারাদেশ

প্লাস্টিক ও মেড স্বচ্ছ পানিতে গ্রামের মানুষ গোসল করতেন, রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির কাজ করতেন, সেই পানিই এখন দূষণের কারণে ব্যবহার

2026-07-23T12:31:42+00:00
2026-07-23T12:31:42+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ছড়াল মেডিকেল বর্জ্য, দূষিত লেমুঝিড়ির পানি
বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩১ পিএম 
পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে এসব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে কৃষিজমিতে। ছবি : সময়ের আলো
প্লাস্টিক ও মেড স্বচ্ছ পানিতে গ্রামের মানুষ গোসল করতেন, রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির কাজ করতেন, সেই পানিই এখন দূষণের কারণে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিক, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ইনজেকশনের সূঁচ, সালাইনের ব্যাগসহ বিভিন্ন মেডিকেল বর্জ্যে ভরে গেছে লেমুঝিড়ি। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে এসব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের কৃষিজমিতে। এতে নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি, বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি।

বান্দরবান সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লেমুঝিড়ির আগা ঘোনা পাড়ায় সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝিড়ির পানির সঙ্গে নেমে আসা পৌরসভার বিভিন্ন বর্জ্য বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও জমে আছে প্লাস্টিকের স্তূপ, কোথাও পড়ে আছে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও ইনজেকশনের সূঁচ, আবার কোথাও মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে ভাঙা কাঁচ ও ধারালো বর্জ্য।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই টানা অতিভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার সময় বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের পাশে পৌরসভার অস্থায়ী বর্জ্যস্তুপে জমে থাকা ময়লা এক্সকাভেটর দিয়ে পাশের লেমুঝিড়িতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে বন্যার পানির সঙ্গে এসব বর্জ্য ভেসে গিয়ে নিচু এলাকার কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে।

তাদের দাবি, শুধু এবারই নয়, গত কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের ঢালে ফেলা বর্জ্য নিচের জমিতে নেমে আসে। তবে এবারের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ একর তিন ফসলি জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

ভুক্তভোগী কৃষক সুমন বড়ুয়া বলেন, ‘এখন জমিতে নামাও ঝুঁকিপূর্ণ। চাষ করতে গেলে মাটির নিচ থেকে প্লাস্টিক, সিরিঞ্জ, ইনজেকশনের সূঁচ ও ভাঙা কাঁচ বের হচ্ছে। এসব কারণে জমিতে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’

আরেক কৃষক সুজাতা তনচঙ্গ্যা জানান, বর্জ্যের কারণে তার প্রায় এক একর আড়াই কানি জমিতে নিয়মিত চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে সিত্তি রঞ্জন তনচঙ্গ্যা, আদরময় তনচঙ্গ্যা ও শান্তিময় তনচঙ্গ্যার কৃষড়ির পানিতে গোসল, রান্নাবান্না ওিজমিও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতির মুখে রয়েছে।

শুধু কৃষিজমি নয়, দূষণের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় পানির উৎসেও। স্থানীয় বাসিন্দা মোবিনা বেগম বলেন, ‘আগে এই ঝিড়ির পানিতে গোসল, রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির সব কাজ করতাম। এখন পানিতে নামলে শরীরে চুলকানি হয়, বড় বড় গুটি ওঠে। এই পানি আর কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় না।’

পৌরসভার বর্জ্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও। লেমুঝিড়ি আপন নগর জ্ঞানদর্শন-বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ জ্ঞানদ্বীপ ভিক্ষু বলেন, ‘গত দুই-তিন বছর ধরে বিহারের পাশের পাহাড়ে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। বর্ষা এলেই এসব বর্জ্য ধানক্ষেতে চলে আসে। দুর্গন্ধের কারণে বিহারে ধ্যান, ভাবনা, আহার ও বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, উন্মুক্ত স্থানে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে মেডিকেল বর্জ্য খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় কৃষিজমি, ঝিড়ির পানির উৎস, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

তারা দ্রুত নিরাপদ স্থানে বর্জ্য অপসারণ, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।


এ বিষয়ে পৌরসভার বর্জ্য অপসারণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা দিদারুল হক চৌধুরী বলেন, ‘লেমুঝিড়ির আগা ঘোনা পাড়া পৌরসভার সীমানার বাইরে। যেখানে ধানের জমিতে বর্জ্য পড়েছে, সেটির দায় জেলা প্রশাসনের। প্রয়োজন হলে সরকারি বরাদ্দ এনে বর্জ্য অপসারণ করতে হবে।’

তবে কৃষকদের অভিযোগ, গত বর্ষায় পৌরসভার অস্থায়ী বর্জ্যভাগার থেকে এক্সকাভেটরের মাধ্যমে বর্জ্য ধানের জমির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে দিদারুল হক চৌধুরী বলেন, বিষয়টি পৌর প্রশাসকের নির্দেশে সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বন্যার সময় কর্মীদের ধানের জমিতে বর্জ্য ফেলতে কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি।

বান্দরবান পৌর প্রশাসক এস. এম. মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘পৌরসভার বর্জ্যে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমিতে থাকা বর্জ্য কীভাবে অপসারণ করা যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি পুনরায় চাষযোগ্য করার বিষয়ে কাজ চলছে।’

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   পাহাড়ি ঢল  ছড়াল মেডিকেল বর্জ্য  দূষিত  লেমুঝিড়ির পানি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: