কৃষকের স্বপ্ন এখন পানির নিচে

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

সারাদেশ

নদীবেষ্টিত জেলা গাইবান্ধা। এই জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৭৫টি চরাঞ্চল রয়েছে, যেগুলো সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে

2026-07-23T20:51:35+00:00
2026-07-23T20:52:46+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
কৃষকের স্বপ্ন এখন পানির নিচে
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৮:৫১ পিএম  আপডেট: ২৩.০৭.২০২৬ ৮:৫২ পিএম
জলাবদ্ধতার কবলে ফসলি জমি। ছবি : সময়ের আলো
নদীবেষ্টিত জেলা গাইবান্ধা। এই জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৭৫টি চরাঞ্চল রয়েছে, যেগুলো সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় পানির নিচে। মধ্য জুলাই থেকে টানা হালকা-ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে জেলার সব উপজেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলের খেত। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমন ধানের বীজতলা, যা দিয়ে চলতি মৌসুমে পুরো জেলার আমন আবাদের ভিত গড়ে ওঠার কথা ছিল।

গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব বলছে, উজানের ঢল আর বৃষ্টির জলে মোট ১২৪ দশমিক ৪ হেক্টর বা প্রায় এক হাজার বিঘা জমির ফসল সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে গেছে। এ ছাড়া, পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঝুঁকিতে রয়েছে আরও ৩৭৯ দশমিক ৫ হেক্টর বা প্রায় ২ হাজার ৯০০ বিঘা জমির ফসল।

ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের তালিকায় আছে আমনের বীজতলা, আউশ ধান, মরিচ, আদা, হলুদ, শাকসবজি ও পাট। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে বীজতলায়। সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়া আমনের বীজতলার পরিমাণ ৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর (২৫২ বিঘা)। আউশের খেত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ৬২ হেক্টর (৪৬৫ বিঘা) জমির। পাটের ক্ষতি হয়েছে ২৪৫ হেক্টর, মরিচ সোয়া ১ হেক্টর, আদা ও হলুদ শূন্য দশমিক ১ হেক্টর করে এবং শাকসবজি ২৫ হেক্টর জমির।

পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফসলের মাঠ। ছবি : সময়ের আলো

পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফসলের মাঠ। ছবি : সময়ের আলো


অন্যদিকে, এখনো পানিতে ডুবে থাকা ফসলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আউশ ১৪১ হেক্টর বা ১ হাজার ৫৭৬ বিঘা আর আমনের বীজতলা তলিয়ে আছে ১৩২ হেক্টর জমিতে। জেলায় মোট প্রায় ৭ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে এবার বীজতলা তৈরি করা হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ। বীজতলাসহ জেলায় প্রায় ৩১০ হেক্টর জমির শাকসবজিও এখন পানির নিচে।

কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সাধারণত বীজতলা তৈরি করেন কৃষকেরা আর সেই চারা রোপণ করা হয় শ্রাবণের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভাদ্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এবারও চাষিরা সময়মতোই বীজতলা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু চারার বয়স যখন মাত্র ১০ থেকে ২৫ দিন, ঠিক তখনই নেমে আসে টানা বৃষ্টি। প্রায় সব বীজতলা তলিয়ে যায় পানির নিচে।

কৃষি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আমনের বীজতলার বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই জলাবদ্ধতার কারণেই। গত বছরও একই কারণে আমন চারার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল এবং দাম বেড়েছিল কয়েক গুণ। কোনো কোনো এলাকার কৃষক দুই থেকে তিন দফা আমন রোপণ করেও শেষ পর্যন্ত ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। কৃষকদের আশঙ্কা, এবারও চারার সংকট দেখা দিতে পারে।


তবে স্বস্তির খবর হলো, আমনের চারা রোপণের সময়সীমা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। কৃষি বিভাগ বলছে, সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আমনের চারা রোপণের সুযোগ আছে। ফলে, জলাবদ্ধতার পানি দ্রুত নেমে গেলে নতুন করে বীজ বোনার সুযোগ এখনো রয়েছে।

সরেজমিন গাইবান্ধা সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বীজতলার জমির কোথাও চারার আংশিক অস্তিত্ব চোখে পড়লেও অধিকাংশ জমিতেই চারার আর কোনো চিহ্ন নেই, শুধু পড়ে আছে পানিবদ্ধ ফাঁকা জমি। 

জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও একই দুর্দশা। বীজতলার পাশাপাশি আউশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায়। সুন্দরগঞ্জে তিস্তার অববাহিকা এলাকায় উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বীজতলা ও ফসলি জমি।

গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক রিয়াজউদ্দিন জানান, বৃষ্টির কারণে তার ৬ বিঘা জমি আবাদের জন্য তৈরি বীজতলা পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। বীজ, হাল, সার ও শ্রমিকসহ ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ করেও এখন কীভাবে জমি রোপণ করবেন, তা তিনি জানেন না।


একই গ্রামের চাষি মন্তাজ মিয়া জানান, ৩ বিঘা জমির জন্য আধা মন বীজ ফেলেছিলেন তিনি। চারা গজানোর কয়েক দিনের মধ্যেই অতিবৃষ্টিতে তা তলিয়ে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সরকারিভাবে চারা রোপণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানান তিনি।

আরেক কৃষক আব্বাস আলীর ভাষ্য, তাদের এলাকায় ফসলের মাঠের পানি নিষ্কাশন নালার অভাব রয়েছে। এই কারণে প্রতিবছরই জলাবদ্ধতায় কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় তাদের। 

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাশিমবাজারের কৃষক রমজান জানান, ঘন ঘন বৃষ্টিতে বীজতলা ডুবে যাওয়ায় প্রায় সব চারাই নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বাধ্য হয়ে বেশি দামে নতুন বীজধান কিনতে হয়েছে তাকে। ফলে, আমন চাষে প্রায় ২০ দিন পিছিয়ে যাবেন তিনি। 

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জিয়াউল হক জানান, আমনের বীজতলা তৈরি বা বীজ বপনের সময় এখনো আছে, তবে প্রতিবন্ধকতাও কম নয়। এখনো সিংহভাগ জমির পানি নামেনি, তার ওপর থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বীজতলাসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতির হিসাব ইতোমধ্যে জেলা পর্যায়ে পাঠানো হচ্ছে।


গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকার অনেক আমন বীজতলা এখনো পানির নিচে ডুবে আছে এবং চারা আক্রান্ত হয়েছে। তবে, পানি নেমে যাওয়ার পর সঠিক পরিচর্যা করা হলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালকের (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্বে থাকা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধির কারণে জেলায় বীজতলাসহ মোট ১২৪ দশমিক ৪ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। বীজতলাসহ আরও ৩৭৯ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ফসল এখনো পানিতে আক্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন হলে আক্রান্ত ফসলের একটি বড় অংশ হয়ত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।’

তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে এবং সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে।

গাইবান্ধার ৭টি উপজেলার নদীবেষ্টিত ভূপ্রকৃতি আর প্রায় ১৭৫টি চরাঞ্চলের বাস্তবতায় বৃষ্টিতে ফসলহানির শঙ্কা যেন প্রতিবছরের এক অনিবার্য চক্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের নালা বা খালের অভাবে একই এলাকার কৃষকদের প্রতিবছরই কোনো না কোনো ফসল হারাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এবারও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রশ্ন একটাই, সরকারিভাবে বীজতলা পুনর্গঠন ও চারা সরবরাহে জরুরি সহায়তা না এলে আসছে আমন মৌসুমে গোলায় ধান তুলতে পারবেন তো তারা?

সময়ের আলো/মহু



  বিষয়:   কৃষক  স্বপ্ন  পানি  জলাবদ্ধতা  ফসল  বীজতলা  গাইবান্ধা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: