দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়ার পাড়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরসহ শতাধিক বসতবাড়ি ভাঙনের মুখে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। প্রতিদিন একটু একটু করে নদী গিলে খাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, বসতভিটা, ফসলি জমি ও জীবিকার শেষ সম্বল। ঘর হারানোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদীপাড়ের পরিবারগুলোর। তাদের একটাই প্রশ্ন-পরদিন সূর্য উঠলে আদৌ কি নিজের ঘরটুকু অক্ষত অবস্থায় দেখতে পাবে কি না?
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্প ও করতোয়ার নদীতীরবর্তী এলাকা এমন চিত্র দেখা যায়।
নদীর ভাঙন এতটাই কাছে চলে এসেছে যে, বাসিন্দাদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন কখন নদীগর্ভে বিলীন হবে তাদের শেষ আশ্রয়টুকু। সন্ধ্যা নামলেই বুকের ভেতর অজানা শঙ্কা কাজ করে, কখন ঘর নিয়ে নদীতে তলিয়ে যেতে হয় এই ভয় নিয়েই দিন কাটছে তাদের।
এলাকাবাসী জানান, টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে করতোয়া নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার পর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নদীর তীর ধসে আশ্রয়ণ প্রকল্পের একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে পানি। ইতোমধ্যে প্রকল্পের কয়েকটি ঘর ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পাশাপাশি নদীতীরবর্তী বহু স্থানীয় বাসিন্দার বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। প্রতিদিন ভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে কমে যাচ্ছে চাষের জমি, হারিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সংসারের স্মৃতি।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা গোলাপি বেগম বলেন, অনেক কষ্টের পর সরকার আমাদের থাকার জন্য এই ঘর দিয়েছে। এই ঘরই এখন হারানোর ভয় হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নুর ইসলাম বলেন, শুধু আশ্রয়ণের ঘর নয়, আমাদের বসতবাড়ি আর আবাদি জমিও নদী গিলে খাচ্ছে। ছোট ছোট সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচবো সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে।
আরেক বাসিন্দা সুরাইয়া বেগম বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই বুক ধড়ফড় করে। নদীর পাড়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কখন যে ঘর নদীতে চলে যায়!
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে করতোয়া নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকলেও স্থায়ী প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রতি বর্ষায় নদীর আগ্রাসনে নতুন নতুন এলাকা বিলীন হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ছাড়াও আশপাশের শতাধিক বসতবাড়ি, বিস্তীর্ণ আবাদি জমি, গ্রামীণ সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কুলানন্দপুর গ্রামের শহিদ আইয়ুব আলী স্মৃতি সংসদ ও পাঠাগারের সভাপতি মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম বলেন, করতোয়ার অব্যাহত ভাঙন এখন শুধু মাটি নয়, কেড়ে নিচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
স্থানীয়দের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে নদীর তীর সংরক্ষণ, টেকসই ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিতে থাকা আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিবারগুলোর পাশাপাশি নদীপাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত স্থায়ী বাসিন্দাদেরও নিরাপদ পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবানা তানজিন জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। খুব দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সময়ের আলো/জোই