অবিরত ভারী বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের সঙ্গে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং প্রাকৃতিক খাল দখলের মহোৎসবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। উপজেলার পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে পরিচিত নদীকেন্দ্রিক ২৭টি প্রধান প্রাকৃতিক খাল পলি জমে ও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের দখলে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ি পানি সাগরে নামতে পারছে না। এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই লোকালয় প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়ছেন লাখো মানুষ।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সীতাকুণ্ড উপজেলাটি মূলত পাহাড় ও বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত। ফলে পাহাড়ি ঢলের পানি স্বাভাবিক নিয়মে নদী ও খাল হয়ে সাগরে গিয়ে পড়ার কথা থাকলেও তা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। উপজেলার সলিমপুর, লতিফপুর, সোনাইছড়ি, বার আউলিয়া, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, বাড়বকুণ্ড, মুরাদপুর, বারৈয়াঢালা, ছোট দারোগারহাটসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের পাশাপাশি পৌরসভার পানি বঙ্গোপসাগরে নিষ্কাশনের জন্য ২৭টি প্রাকৃতিক খাল রয়েছে।
তবে দীর্ঘদিনের অসংস্কার, পলি জমতে থাকা এবং শিল্প কারখানা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের বেপরোয়া দখলের কারণে খালগুলোর কার্যকারিতা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে।
ভুক্তভোগী অধিবাসীদের অভিযোগ, একাধিক বড় শিল্প কারখানা তাদের প্ল্যান্ট ও সীমানা সম্প্রসারণ করতে গিয়ে সরকারি প্রাকৃতিক খালের স্বাভাবিক গতিপথ বদলে দিয়েছে কিংবা মাটি ভরাট করে পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। উঁচু সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কারণে পাহাড়ি পানি চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ স্লুইসগেট অকার্যকর থাকায় এবং বর্ষার রাতে কারখানার ভেতরের জমে থাকা পানি পাম্পের সাহায্যে বাইরের লোকালয়ে ছেড়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি রূপ নিচ্ছে কৃত্রিম ‘মানবসৃষ্ট বন্যায়’। ফলে উপজেলার শত শত বসতবাড়িতে কোমর সমান পানি ঢুকে মূল্যবান আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে।
জলাবদ্ধতার প্রভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিম পাশের বিস্তৃত নিম্নাঞ্চলের শত শত একর আবাদি কৃষি জমি ও সবজির খেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুর ও মাছের ঘের, যার ফলে মৎস্য চাষিরা কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
অন্যদিকে, প্লাবিত রাস্তায় শিল্প কারখানার ভারী যানবাহন চলাচলের ফলে হাঁটু সমান কাদার সৃষ্টি হয়েছে, যা স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ পথচারীদের চলাচলে চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি করছে।
শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর এই অনিয়ন্ত্রিত ভূমিকার প্রতিবাদে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রতি শীতলপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ কারখানার সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এ ঘটনাকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং ‘মানব সৃষ্ট বন্যা’ আখ্যা দিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসন (ইউএনও) এবং স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, কেবল অতিবৃষ্টিকে দায়ী করে দায় এড়ানো যাবে না। দীর্ঘদিন খালগুলো পুনঃখনন না করা এবং বেপরোয়া দখলদারিত্বের কারণেই আজকের এই পরিস্থিতি। আপদকালীন মাইকিং না করে দ্রুত খালগুলো খনন করা এবং পানি চলাচলের জন্য কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ইতঃপূর্বেও তদন্তে একাধিক কারখানার বিরুদ্ধে সরকারি খাল ভরাটের প্রমাণ মিলেছে। তদন্ত সাপেক্ষে দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভরাট হওয়া ২৭টি খাল পুনঃখননসহ দখল হওয়া সরকারি জায়গা পুনরুদ্ধারে খুব শিগগিরই বিশেষ অভিযান চালানো হবে।
সময়ের আলো/জেডি