ককরোচ ডেমোক্র্যাসি : নিরস্ত্র এবং বিপজ্জনক

অরুন্ধতী রায়

আন্তর্জাতিক

বছরের পর বছর পেরিয়ে ভারতীয় হিসেবে গর্ব অনুভব করার মতো একটি মুহূর্ত এসেছে। যখন আশা প্রায় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল,

2026-07-24T03:51:57+00:00
2026-07-24T03:51:57+00:00
 
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ককরোচ ডেমোক্র্যাসি : নিরস্ত্র এবং বিপজ্জনক
অরুন্ধতী রায়
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ৩:৫১ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
বছরের পর বছর পেরিয়ে ভারতীয় হিসেবে গর্ব অনুভব করার মতো একটি মুহূর্ত এসেছে। যখন আশা প্রায় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখনই তারা এলো। তারা হলো, বৃষ্টির সঙ্গে ভেসে আসা তরুণ ককরোচের দল। যাদের জন্ম হয়েছে একদিকে বিচারকের অহংকারী মন্তব্য ও অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদের মিশ্রণে। সবাই হয়তো ঘটনাটি জানেন, তবুও স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাক। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত একবার কিছু বেকার তরুণকে অবজ্ঞাভরে ‘ককরোচ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এর জবাবে বোস্টনে পড়াশোনা করা এক শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে ইনস্টাগ্রামে লিখেছিলেন, যদি সব ককরোচ একত্রিত হয়ে যায়?

তার এই প্রশ্নটি লাখো মানুষের মনে দাগ কাটে। এভাবেই গড়ে উঠল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। দীপকে হয়ে উঠলেন এই নতুন আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী। তাদের প্রথম ও প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। যিনি এক দুর্নীতিগ্রস্ত ও পচন ধরা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষে বসে আছেন। যেখানে প্রতিনিয়ত পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। বিরোধী দলগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত এমন ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১৫২ বার। এই কেলেঙ্কারি লাখো তরুণের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিয়েছে।

বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকের বাবা-মা তাদের পড়াশোনার খরচ ও পরীক্ষার ফি দেওয়ার জন্য নিজেদের জমি-বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। এক ধরনের অবৈধ কিন্তু প্রচলিত চাঁদাবাজির নতুন রূপ এটি। সম্প্রতি জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যাও করেছেন।

এই ক্ষোভ ধীরে ধীরে অনলাইনে এক বিশাল ঢেউয়ে রূপ নিলে অভিজিৎ দীপকে ৬ জুন বোস্টন থেকে দেশে ফিরে সরাসরি দিল্লির বিখ্যাত প্রতিবাদস্থল যন্তরমন্তরে পৌঁছান। লাদাখের সুপরিচিত শিক্ষাবিদ ও সামাজিক কর্মী সোনম ওয়াংচুক তার সঙ্গে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মুক্তি) ছাত্র সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ বা এইসার ছয় শিক্ষার্থী নেহা বোরা, মনীষ কুমার, আমিন অমিতোষ, দানিশ আলি, হৃষিকেশ ও দীপকও অনশনে বসেন।

ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য শহরেও প্রতিবাদ শুরু হয়। অনশনকারীদের শারীরিক অবস্থা যখন সংকটজনক হয়ে পড়ে, তখন ইন্টারনেটে সক্রিয় হাজারো তরুণ বাস্তবেই যন্তরমন্তরে উপস্থিত হতে শুরু করেন। ককরোচ জনতা পার্টি ঘোষণা দেয় যে, সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার দিন ২০ জুলাই তারা সংসদ ভবন অভিমুখে বিশাল মিছিল করবেন।

মিছিলের দুদিন আগেই পুলিশ সোনম ওয়াংচুককে প্রতিবাদ মঞ্চ থেকে তুলে নিয়ে যায়। প্রথমে তাকে সরকারি হাসপাতালে রাখা হয়, পরে তার স্ত্রীর জোরদার দাবির মুখে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে তিনি এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০ জুলাই সকালে মিছিল শুরুর ঠিক আগে এইসারের ছাত্ররা তাদের অনশন প্রত্যাহার করেন।

গত সোমবারের দিনটি অন্যদিনের মতো ছিল না। ট্রেন, বাস, বিমান ও মেট্রোতে সারা দেশ থেকে মানুষ আসতে শুরু করেছেন। ঘণ্টায় ঘণ্টায় তাদের সংখ্যা বাড়ছে। সকালের সূর্য দিল্লির বর্ষার মেঘলা আকাশকে আলোকিত করার আগেই হাজারো মানুষ যন্তরমন্তরে পৌঁছে যান। সূর্য উঠতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে ভবিষ্যৎ যাদের চোখের সামনে মুছে গেছে, এমন হতাশ ও ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম ফিরিয়ে নিতে চায় সেই মর্যাদা ও অধিকার, যা পূর্ব প্রজন্মগুলো ধীরে ধীরে ছেড়ে দিয়েছেন।

একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লড়াই এটি। নিজেদের সাহস, সংযম ও ব্যঙ্গাত্মক মনোভাব দিয়ে তারা সেই ভয় দূর করে দিয়েছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের রক্তে মিশে গিয়েছিল। দিন শেষে দেখা যায়, এই আন্দোলন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির চেয়েও অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন ধর্মেন্দ্র প্রধানের প্রসঙ্গ গৌণ হয়ে গেছে; আসল প্রশ্ন উঠে এসেছে পুরো শাসনব্যবস্থার পচন, যা শীর্ষ থেকে নিচতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এবং একটি পচা-গলা মৃতদেহের মতো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এমনকি আট-সাত বছর বয়সের ক্ষুদ্রতম ‘ককরোচ’ শিশুরাও পরিষ্কার এই কথাটি বলতে পারছিল।

মিছিলের কয়েক দিন আগেই নতুন পুলিশপ্রধান নিযুক্ত করা হলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর ভাবমূর্তি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হলেও পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ২০ জুলাইয়ের এই বিশাল ঢেউয়ের মাত্রা বুঝতেই পারেনি। তারা সবরকম চেষ্টা করেছেন। বাস চলাচল বন্ধ করেছেন, সড়ক অবরোধ করেছেন, মেট্রো স্টেশন বন্ধ রেখেছেন, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি। ইন্টারনেটের সাহায্যে বেড়ে ওঠা তরুণরা মিম ও ভিডিওর ঢেউ দিয়ে সেই বাধা ভেঙে দিয়েছেন, যা দেখে মানুষ একই সঙ্গে হাসতে ও কাঁদতে বাধ্য হয়েছেন।

দিল্লির মতো শহরেও প্রতিবাদে অংশ নেওয়া তরুণীরা বলছিলেন, তারা ভিড়ের মধ্যেও নিরাপদবোধ করছেন। যদিও কেউ কেউ পুলিশের দ্বারা শারীরিক হয়রানির অভিযোগও করেছেন। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ সব ধর্ম ও শ্রেণির মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়েছেন। একে অন্যকে সাহায্য ও রক্ষা করছেন। তারা কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা দেননি বরং তাদের কাজ দিয়েই দেখিয়েছেন আমাদের স্বপ্নের ভারতটা আসলে কেমন হতে পারে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ধাতব বেড়া দিয়ে প্রতিবাদস্থল ঘিরে ফেলে, পাথর ছোড়ার অজুহাত দেখানোর জন্য আগে থেকেই পাথরভর্তি ট্রাক ও ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখে, যাতে মনে হয় তরুণরা হিংসাত্মক হয়েছেন ও পুলিশ আত্মরক্ষার্থে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। সাদা পোশাকের গুন্ডাদের লাঠি নিয়ে মাঠে নামিয়েছে বিজেপি। র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স তাদের ইউনিফর্ম থেকে নাম-নম্বরের ট্যাগ খুলে ফেলেছে। মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে মিথ্যা প্রচারণা চালানোর জন্য। মোদি মিডিয়ার কেউ কেউ যা ঘটেনি তারও আগাম প্রতিবেদন দিতে শুরু করেন। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি। পুলিশ ও সেনাবাহিনী লাঠি চালিয়ে শিশুদের মাথা ফাটিয়ে দেয়, ছত্রভঙ্গ করে দেয়, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। 

তবুও তরুণরা পিছু হটেননি, সরাসরি এগিয়ে যান সংসদ ভবনের দিকে। নিরাপত্তা বাহিনী তাদের দিকে একে-৪৭ রাইফেল তাক করে দাঁড়ালেও থেমে যাননি। এই মিছিল পুরোপুরি শাসকদলের মুখোশ খুলে আসল চেহারা সামনে এনেছে। যারা লোহার মুষ্টি দিয়ে শাসন করা এক স্বৈরাচারী শক্তি, যাদের দেশের ইতিহাস ও বৈচিত্র‍্য বোঝার ক্ষমতা নেই, যারা শুধু ঘৃণা করতেই জানেন। যারা ভালোবাসা বা যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।

মিছিল এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গর্বিত প্রধানমন্ত্রীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। সংসদ সদস্যদেরও নতুন সংসদ ভবন থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি। অথচ ওই ভবনটি যেন প্রতিদিনই সংবিধান অসম্মান করার জন্য তৈরি হয়েছে। সন্ধ্যা নাগাদ পুলিশ প্রতিবাদের মূল মঞ্চ ভেঙে ফেললেও রাত নামার আগেই মানুষ আবার তা পুনরুদ্ধার করেন। রাতে পুলিশ পিছু হটলে ‘ককরোচ’রা তাদের প্রতি করতালি দিয়ে উচ্চস্বরে বলেন, বাহ মোদি জি, বাহ! শিশুদের পিটিয়ে দেখালেন ক্ষমতা।

এই আন্দোলন থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন আশা করা হয়তো অসম্ভব, কিন্তু একে শুধু উচ্ছ্বাসের মুহূর্ত বলে উপেক্ষা করাও ভুল হবে। বিদেশি অর্থায়ন, সিআইএর ষড়যন্ত্র এসব গুজব ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ছে গণমাধ্যমে। একজন স্বাধীন লেখক ও সমাজকর্মী হিসেবে আমিও প্রথমে সন্দেহের চোখে দেখছিলাম। ভাবছিলাম এই আন্দোলনটি যেন ২০১১ সালের আন্না হাজারের আন্দোলনের মতো না হয়ে যায়। সেই আন্দোলনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ভালো ছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা এমন এক রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় এনে দেয়, যারা গত তিন মেয়াদে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, নিজেদের দল ও সরকার এক করে ফেলেছে এবং দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে অসম্মানিত করেছে।

কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টির প্রতি মূলধারার গণমাধ্যম ও শাসকদলের শত্রুতা দেখে আমার সন্দেহ দূর হয়। অভিজিৎ দীপকে যিনি দলিত সম্প্রদায় থেকে এসেছেন, তা জেনে আমি আরও আনন্দিত হই। তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হই এই কারণে যে কেউ তার জাতি নিয়ে কথা বলছেন না। যেদিন তিনি বললেন, যদি আমার নাম খালিদ হতো বা আমি মুসলিম হতাম, তবে এতদিনে জেলে বন্দি থাকতাম। সেদিনই আমার মনের সমস্ত সন্দেহ মুছে যায়।

তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন ভারতের বাস্তবতা এখানে আইনও সমানভাবে প্রয়োগ হয় না; সবকিছু নির্ভর করে ধর্ম, জাত, শ্রেণি ও লিঙ্গের ওপর। এমন সত্য বলার সাহস আজকের দিনে রাজনীতিবিদেরও নেই। কারণ তারা ‘হিন্দু প্রতিক্রিয়ার’ ভয়ে ‘মুসলিম’ শব্দটির পরিবর্তে ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ বলতে পছন্দ করেন। তিনি যখন ‘খালিদ’ নামটি উল্লেখ করেন, তখন আমার মনে পড়ে জেএনইউর পণ্ডিত উমর খালিদের কথা। যিনি শারজিল ইমামসহ অন্যদের সঙ্গে প্রায় ছয় বছর ধরে বিনা বিচারে জেলে বন্দি। তার অপরাধ কী?

২০২০ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সময় তিনি মানুষকে অহিংস পথে চলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। যদিও তখন দিল্লিতে হিন্দু সংগঠনের গুন্ডারা পুলিশের চোখের সামনে আগুন লাগাচ্ছিল, খুন করছিল ও মসজিদ ভেঙে ফেলছিল। তার জামিনের আবেদন বারবার খারিজ করা হয় এমন বিচারকদের দ্বারা, যাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসটুকুও হারিয়ে গেছে।

মিছিল এগিয়ে চললে আমি ভাবছিলাম সৌভাগ্যক্রমে এদের অধিকাংশ মুসলিম বা শিখ বা আদিবাসী নয়। যদি তাই হতো, তবে তাদের পথ রক্তে ভাসিয়ে দেওয়া হতো, গুলি করে মারা হতো বা জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। কাশ্মিরি হলে তাদের চোখ অন্ধ করে দেওয়া হতো। তাই ভালোই হলো যে এদের অধিকাংশ হিন্দু এবং এটাই আজকের ভারতের বাস্তবতা। কিন্তু পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। অন্য রাজ্য থেকে হাজার হাজার আধাসামরিক বাহিনী আনা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সামনের দিনগুলো কী নিয়ে আসবে, কেউ তা জানে না।

আন্না হাজারের আন্দোলনের মতো এই আন্দোলনের পেছনে কোনো বড় রাজনৈতিক সংস্থা বা গণমাধ্যমের সমর্থন নেই শুধু ইন্টারনেট ও নিজেদের শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলছেন তারা। কোনো সংগঠিত বিরোধী দলও নেই, যারা এই ক্ষোভকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন। তাই যদি সত্যিকারের রাজনৈতিক কাজ শুরু না হয়, যদি বড় নেতারা নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ভুলে ঐক্যবদ্ধ না হন, তবে এই স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ ধীরে ধীরে মুছে যেতে পারে। সরকারও জানে এই বাস্তবতাÑ তাই তারা অপেক্ষা করছেন। ক্ষমতাধরদের অপেক্ষা করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের নেই।

এই মুহূর্তে ককরোচদের আন্দোলন ভারতজুড়ে বিভিন্ন প্রতিবাদের অংশ মাত্র। মধ্যপ্রদেশে আদিবাসীরা নদী সংযোগ প্রকল্পের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, উত্তরাখণ্ডে বনভূমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে, বৃহত্তর নিকোবর দ্বীপের পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে মানুষ সোচ্চার, মণিপুর জ্বলছে, চাকরি কমছে, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। বিজেপি-আরএসএসের ‘ধর্মের খেলা’ ও আসল রূপ প্রকাশ পাচ্ছে। এটা শুধু মানুষের বিশ্বাস পুঁজি করে লুটপাট চালানোর এক কৌশল মাত্র। অযোধ্যার রাম মন্দিরের নামে যেভাবে সম্পদ আহরণ ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসা চালানো হচ্ছে, তা দেখলে বোঝা যায় পুরো ব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতি কতটা বিস্তৃত।

প্রশ্ন হলো, এই ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা কি এই তরুণদের মধ্যে আছে? উত্তর হলো- এই পথটা সহজ নয়। ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাস তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। ষাট-সত্তর দশকের নকশাল আন্দোলন সম্পদ ও জমির বণ্টন চেয়েছিল কিন্তু দমন করা হয়েছে। নব্বই দশকে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন বা মাওবাদী আন্দোলন জমি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল তাদেরও দমন করা হয়। ২০০০ সালের পর মানুষ শুধু ক্ষুদ্র কিছু সুবিধার জন্য লড়াই করছেন যেমন এনআরইজিএ কর্মসূচির মতো সামান্য সুযোগ, যা এখন প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালে এসে আমরা এমন অবস্থায় পৌঁছেছি যে এখন শুধু ভোট দেওয়ার ও নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থা এমন এক পদ্ধতি, যা নাৎসি জার্মানির নিয়মের মতো নাগরিকত্ব নির্ধারণ করবে। এখন পাসপোর্টও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। লাখো মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। কে বৈধ, কে অবৈধ কেউ জানেন না।

বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে এই আন্দোলন তুলনা করা যায় না। ভারত বিশাল দেশ, এখানে পরিস্থিতি ভিন্ন। তবে এই তরুণদের সাহস আমাদের জন্য এক নতুন আশা নিয়ে এসেছে। কৃষকরা আবার দিল্লির পথে রওনা হয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির বিরুদ্ধে। তাদের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা হলেও তারা থামবেন না। সত্যি বলতে, এই শাসকদলের দিন শেষ হয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী সশরীরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হবেন, তার রাজনৈতিক পতনও খুব বেশি দূরে নেই। কিন্তু তারা সহজে হার মানবেন না। রাজধানীর রাস্তায় তাদের অপমান মেনে নেওয়ার মতো নয়। রক্তপাতের আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু আমাদেরও দায়িত্ব আছে। তরুণরা যে সাহস দেখিয়েছেন, তা যেন বৃথা না যায়। তাদের দেওয়া উপহার সার্থক করে তোলার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।

লেখকের মতামতটি ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এ প্রকাশিত হয় বুধবার। সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য সেটির ভাবানুবাদ তুলে ধরা হয়েছে এখানে।

সময়ের আলো/আআ
  বিষয়:   ককরোচ  ডেমোক্র্যাসি  নিরস্ত্র  বিপজ্জনক  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: