ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সদ্য সমাপ্ত সপ্তাহে টানা পতনে প্রধান সূচক ও লেনদেনে বড় ধরনের ধস নামলেও উল্টো চিত্র দেখা গেছে ঝুঁকিপূর্ণ বা জাঙ্ক শেয়ারে (জেড ক্যাটাগরি)। সপ্তাহজুড়ে সার্বিক বাজারে মন্দাভাব থাকার পরও দরবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় বড় প্রভাব বিস্তার করেছে দুর্বল আর্থিক ভিত্তির এসব কোম্পানি। পুঁজিবাজার নিয়ে সাপ্তাহিক বাজার বিশ্লেষণে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৯ থেকে ২৩ জুলাই সপ্তাহের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৯৬ দশমিক ০৬ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৫,৮০৪ দশমিক ৩০ পয়েন্টে। একই সময়ে বাজারটিতে সাপ্তাহিক মোট লেনদেন আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ২৭ দশমিক ৯০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫,৩১৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকায়।
সূচক ও লেনদেনের এমন নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেও দরবৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসে একের পর এক জাঙ্ক শেয়ার। সাপ্তাহিক দরবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় স্থান পাওয়া ফারইস্ট ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্সের মতো বন্ধ প্রায় ও আর্থিক সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর এক সপ্তাহেই প্রায় ১৯ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। প্রধান সূচকের পাশাপাশি সপ্তাহজুড়ে ডিএসইর অন্যান্য সূচকগুলোতেও বড় ধরনের দরপতন পরিলক্ষিত হয়েছে। ডিএস৩০ সূচক এই সপ্তাহে ৩৪ দশমিক ৯১ পয়েন্ট হারিয়ে ২,১৯২ দশমিক ৭২ পয়েন্টে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস ২৩ দশমিক ৮০ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১,১৮৩ দশমিক ০৬ পয়েন্টে।
ডিএসইতে এই সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেন হয়েছে ১,০৬৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা, যেখানে তার আগের সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১,৪৭৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে গড় লেনদেন হ্রাস পেয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। সপ্তাহজুড়ে লেনদেন ৩৯২টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ১২০টির, দর কমেছে ২৪০টি এবং অপরিবর্তিত ছিল ২৬টির।
অর্থাৎ বাজারের প্রায় ৬১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমেছে, যা সার্বিক বাজারের নেতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট করে তোলে। বাজার বিশ্লেষক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মতে, সদ্য সমাপ্ত সপ্তাহে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতনের নেপথ্যে কয়েকটি স্পষ্ট নীতিগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করেছে। সম্প্রতি বিএসইসির মার্জিন রুল সংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিধিমালা এবং এর ফলে বীমা খাতে ব্যাপক দরপতন, মুনাফা তোলার প্রবণতা এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে তারা এ ক্ষেত্রে দায়ী করছেন।
জাঙ্ক শেয়ারে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি : সার্বিক বাজার যখন দরপতনের আতঙ্কে ভুগছে, ঠিক তখনই জেড ক্যাটাগরির বেশ কিছু শেয়ারের দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। সাপ্তাহিক দরবৃদ্ধির তালিকায় দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম স্থান পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে জেড ক্যাটাগরির নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। দরবৃদ্ধিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং তৃতীয় স্থানে থাকা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস- উভয় কোম্পানির শেয়ারদর এক সপ্তাহেই ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আগের সপ্তাহে মাত্র ১ টাকা ২০ পয়সায় লেনদেন হওয়া এই শেয়ারগুলোর দাম সপ্তাহ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ৭০ পয়সায়।
একইভাবে এফএএস ফাইন্যান্স ও পিএলএফএসএল (পিপলস লিজিং) কোম্পানির শেয়ার দর সাপ্তাহিক ভিত্তিতে ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। ১ টাকা ৩০ পয়সার শেয়ার সপ্তাহ শেষে বেড়ে ১ টাকা ৮০ পয়সায় উন্নীত হয়।
এ ছাড়া দরবৃদ্ধির শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় স্থান পাওয়া প্রাইম ফাইন্যান্সের শেয়ার দর ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩ টাকা ৭০ পয়সায় পৌঁছেছে। মৌলিক ভিত্তি দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও এসব কোম্পানির শেয়ারদর হুট করে এভাবে বেড়ে যাওয়াকে অস্বাভাবিক ও ফটকা কারবারিদের কারসাজি বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
জাঙ্ক শেয়ার ছাড়াও এই সপ্তাহে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে মিউচুয়াল ফান্ড খাত। সাপ্তাহিক খাতভিত্তিক রিটার্নে মিউচুয়াল ফান্ড খাত সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন দিয়েছে। দরবৃদ্ধির একদম শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, যার দর এক সপ্তাহেই ৪৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬ টাকা ৮০ পয়সায় দাঁড়ায়। গ্রীন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড এবং এনসিসিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড ১-এর দরও ২৫ শতাংশ করে বেড়েছে। এ ছাড়া খাতভিত্তিক রিটার্নে ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন খাত ২ দশমিক ৬২ শতাংশ লাভ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে সাধারণ বীমা খাতের মার্জিন ঋণ-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম ও জল্পনা-কল্পনার কারণে সবচেয়ে বেশি দরপতনের শিকার হয়েছে বীমা খাত। দরপতনের শীর্ষ তালিকায় প্রথম ১০টি কোম্পানির মধ্যে ৯টিই ছিল বীমা খাতের। মেঘনা ইনস্যুরেন্স ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ দর হারিয়ে সাপ্তাহিক লুজারের শীর্ষে নাম লেখায়।
এ ছাড়া গ্লোবাল ইনস্যুরেন্স, স্ট্যান্ডার্ড ইনস্যুরেন্স এবং প্রভাতী ইনস্যুরেন্সের দর ১১ থেকে ১২ শতাংশের বেশি কমেছে। জাঙ্ক ক্যাটাগরিতে থাকা উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরির শেয়ারদরও ১২ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমে দরপতনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা নিয়েছে।
লেনদেনের শীর্ষে যেসব কোম্পানি : পুঁজিবাজারে লেনদেনের পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষে অবস্থান করছিল বস্ত্র ও ফার্মা খাত। সাপ্তাহিক মোট লেনদেনে বস্ত্র খাতের অবদান ছিল ১৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের অবদান ছিল ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
একক কোম্পানি হিসেবে সাপ্তাহিক সর্বাধিক লেনদেন হয়েছে মালেক স্পিনিংয়ের শেয়ারে, যার মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল টেকনো ড্রাগস (২২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা) এবং তৃতীয় স্থানে ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্টস বা আইটিসি (২০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা)। এ ছাড়া শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, সিটি ব্যাংক, ফারইস্ট নিটিং এবং সি পার্ল রেসোর্টসের শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য লেনদেন দেখা গেছে।
সার্বিক বাজার বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালো মৌল ভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারগুলোর দর সংশোধন ও সার্বিক লেনদেন হ্রাসের পেছনে মূল কারণ হলো নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং মুনাফা তোলার প্রবণতা। অনেক বিনিয়োগকারী প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তার কারণে বড় ও নিরাপদ শেয়ারগুলো থেকে মূলধন গুটিয়ে সাময়িকভাবে পর্যবেক্ষণ অবস্থানে চলে গেছেন। কিন্তু এই সুযোগে একশ্রেণির স্পেকুলেটিভ বা ফটকা বিনিয়োগকারী কমদামি ও জাঙ্ক শেয়ারগুলোতে সস্তা শেয়ার হিসেবে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে দর বাড়াচ্ছে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, যেসব কোম্পানি বছরের পর বছর লভ্যাংশ দিতে পারে না বা যাদের উৎপাদন ও মূল ব্যবসা বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর শেয়ার দর এভাবে লাফিয়ে বাড়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোনো গুজব বা স্বল্পমেয়াদি দরবৃদ্ধির ফাঁদে পা না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মৌল ভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারে সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও