রোগ সারাতে এসে নতুন সংক্রমণ : আইসিইউতে মৃত্যু বাড়াচ্ছে ‘সুপারবাগ’

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফিচার

দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী (ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট) ব্যাকটেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে

2026-07-25T21:40:28+00:00
2026-07-25T21:53:46+00:00
 
  শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬,
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
ফিচার
রোগ সারাতে এসে নতুন সংক্রমণ : আইসিইউতে মৃত্যু বাড়াচ্ছে ‘সুপারবাগ’
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৯:৪০ পিএম  আপডেট: ২৫.০৭.২০২৬ ৯:৫৩ পিএম
সংগৃহীত ছবি
দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী (ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট) ব্যাকটেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে আইসিডিডিআর,বি। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তির সময় এসব ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা রোগীদের অর্ধেকেরও বেশি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আক্রান্ত বা সংক্রমিত হয়েছেন। এ ধরনের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুহারও ছিল অত্যন্ত বেশি। 

গবেষকদের মতে, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে এ ধরনের মৃত্যু ও গুরুতর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

আইসিডিডিআর,বির গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা দুটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ এবং ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার জন্য ঢাকার একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগী এবং একই হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (এনআইসিইউ) ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি থাকা ৩৬৩ জন নবজাতকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

আইসিডিডিআর,বির সহকারী বিজ্ঞানী এবং গবেষণার প্রধান লেখক ড. গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন বলেন, আমরা আইসিইউতে অবস্থানকালীন পুরো সময়জুড়ে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করেছি এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও জিনোম সিকোয়েন্সিং কেরে দেখেছি যে কীভাবে হাসপাতালে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং কীভাবে শরীরে সুপ্ত থাকা ব্যাকটেরিয়া পরবর্তীতে সংক্রমণে রূপ নেয়। এর মাধ্যমে রোগীর বহন করা ব্যাকটেরিয়া (কলোনাইজেশন) এবং পরবর্তীতে হওয়া প্রাণঘাতী সংক্রমণের মধ্যকার সম্পর্কগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।

ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর অর্থায়নে পরিচালিত এ গবেষণায় মূলত ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট রেজিস্ট্যান্ট গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হওয়ায় এ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে এসব ব্যাকটেরিয়া নিউমোনিয়া, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং ক্ষতের সংক্রমণের মতো গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

আইসিডিডিআর,বির আগের একটি গবেষণায় হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ে, এমনকি নবজাতকদের মধ্যেও ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপক উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছিল। নতুন দুটি গবেষণায় আইসিইউতে এসব ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার এবং উন্নত সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমানোর বিষয়ে নতুন তথ্য উঠে এসেছে।


গবেষকেরা ইশেরিশিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি, অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি এবং সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা-এই চারটি প্রধান গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া নিয়ে পরীক্ষা চালান।

গবেষণায় দেখা যায়, আইসিইউর প্রায় অর্ধেক রোগীর (৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ) অন্ত্রে ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট রেজিস্ট্যান্ট গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল। শরীরে রোগ সৃষ্টি না করেও ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিকে কলোনাইজেশন বলা হয়। তবে এ ধরনের রোগীদের নিজের অসুস্থ হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সংক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

এ ছাড়া, শুরুতে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা ১৯৮ জন রোগীর মধ্যে ১০৫ জন (৫৩ শতাংশ) আইসিইউতে অবস্থানকালে সংক্রমিত হয়েছেন, যা হাসপাতালে ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপক বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।

যেসব রোগীর শরীরে ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ কালচার পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে, তাদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইসিইউতে এ সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের ৯০ শতাংশেরও বেশি মারা গেছেন।

গবেষকদের মতে, পর্যবেক্ষণ করা এই অস্বাভাবিক উচ্চ মৃত্যুহারের একটি কারণ হতে পারে সীমিত সুবিধার আইসিইউ সেবার নানা সীমাবদ্ধতা। সীমিত চিকিৎসাসুবিধা, অতিরিক্ত রোগীর চাপ, হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের (নোসোকোমিয়াল ইনফেকশন) ঝুঁকি এবং অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মৃত্যুহার বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

হোল-জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা আরও দেখেছেন, কিছু রোগীর শরীরে শুরুতে নীরব বা সুপ্ত অবস্থায় থাকা ব্যাকটেরিয়াই পরবর্তীতে প্রাণঘাতী সংক্রমণের কারণ হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, শরীরে বহন করা এসব ব্যাকটেরিয়া পরবর্তী সময়ে গুরুতর রোগে রূপ নিতে পারে।

আইসিডিডিআর,বির এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান এবং গবেষণার প্রধান গবেষক (পিআই) ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল হওয়া উচিত আরোগ্যের স্থান, চিকিৎসা নিতে এসে অন্য একটি প্রাণঘাতী সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার জায়গা নয়। যেসব রোগী শুরুতে এসব সহজে সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ছিলেন, তাদের অর্ধেকেরও বেশি রোগীদের অন্ত্রে আইসিইউতে অবস্থানকালে পরবর্তীতে এসব মারাত্মক জীবাণু পাওয়া গিয়েছে যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংকটাপন্ন রোগীদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার জোরদার করা অপরিহার্য।

গবেষকেরা জানান, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা-প্রতিরোধী ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপ্তি তুলে ধরার পাশাপাশি একই গবেষণা দলের দ্বিতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, শক্তিশালী সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে হাসপাতালগুলো সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল’-এ প্রকাশিত ওই গবেষণায় ঢাকার একটি এনআইসিইউতে সুনির্দিষ্ট সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মূল্যায়ন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসারে স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের হাত পরিষ্কার রাখা, পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ বিষয়ে প্রাথমিক ও মাসিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নির্দেশিকা অনুসরণের হার, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মৃত্যুহার এবং কার্বাপেনেম-রেজিস্ট্যান্ট অর্গানিজমের কোলোনাইজেশন পর্যবেক্ষণ করা হয়।

সাত মাস কর্মসূচি চালানোর পর এনআইসিইউতে প্রতি ১০০ জন ভর্তি রোগীর মধ্যে রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ ২৮ জন থেকে কমে ৪ জনে নেমে আসে, যা ৮৬ শতাংশ হ্রাস। একই সময়ে প্রতি ১০০ জন ভর্তিতে মৃত্যুহার ২৬ জন থেকে কমে ৪ জনে দাঁড়ায়। গবেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে শক্তিশালী সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া প্রাণঘাতী সংক্রমণে রূপ নেওয়া উল্লেখযোগ্যভাবে ঠেকানো সম্ভব।

আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, এই গবেষণা দুটি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে প্রকাশ করেছে: আমাদের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা গ্রহণকালে রাগীরা সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন, এবং এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। একই সময়ে গবেষণা দেখায় যে মৌলিক সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করলে সংক্রমণ ও মৃত্যু বহুগুণ কমানো সম্ভব। আমরা যদি রোগীদের রক্ষা করতে এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবেলা করতে চাই, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নীতি নির্ধারকদের অবশ্যই সংক্রমণ প্রতিরোধ, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, নজরদারি এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারকে রোগীর সুরক্ষার মূল অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

গবেষকদের মতে, এ দুটি গবেষণা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সীমিত সম্পদের অন্যান্য দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। হাসপাতালগুলোতে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার এবং রোগীদের ঝুঁকি বাড়লেও হাত ধোয়া, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখা, অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার, নিয়মিত নজরদারি এবং নিরাপদ রোগীসেবার মতো সংক্রমণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করলে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সুরক্ষায় সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ অন্যতম কার্যকর কৌশল।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   আইসিইউ  মৃত্যু  সুপারবাগ  ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট  ব্যাকটেরিয়া 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: