যে গ্রামের কৃষকরা শেক্সপিয়র, হেমিংওয়ে ও কালিদাসকে নিয়ে আলাপ করে

সাজলিন মেহজাবীন চৌধুরী

ফিচার

কর্ণাটকের পশ্চিমঘাটের সবুজ পাহাড়ঘেরা অঞ্চলে একটি ছোট্ট গ্রাম, নাম হেগ্গোডু। কৃষিকাজ, স্থানীয় জীবন ও ছোট ছোট বসতি- সব মিলিয়ে সাধারণ

2026-09-10T21:22:40+00:00
2026-09-10T21:31:01+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
যে গ্রামের কৃষকরা শেক্সপিয়র, হেমিংওয়ে ও কালিদাসকে নিয়ে আলাপ করে
সাজলিন মেহজাবীন চৌধুরী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:২২ পিএম  আপডেট: ১০.০৯.২০২৬ ৯:৩১ পিএম
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গ্রাম হেগ্গোডু। গ্রাফিক : সময়ের আলো
কর্ণাটকের পশ্চিমঘাটের সবুজ পাহাড়ঘেরা অঞ্চলে একটি ছোট্ট গ্রাম, নাম হেগ্গোডু। কৃষিকাজ, স্থানীয় জীবন ও ছোট ছোট বসতি- সব মিলিয়ে সাধারণ গ্রামীণ এক জনপদ। কিন্তু শিবামোগা জেলার সাগর তালুকে অবস্থিত এ জনপদ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গ্রাম নামে পরিচিত। শুনতে বিস্ময়কর হলেও সত্যি, এ গ্রামের কৃষকরা পর্যন্ত শেক্সপিয়র, হেমিংওয়ে ও কালিদাসকে নিয়ে আলোচনা করেন!

এ গ্রামের গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু একটি নাট্যদল। কয়েক দশকের পথ পেরিয়ে নাট্যদলটি থিয়েটার, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, প্রশিক্ষণ এবং বৌদ্ধিক আলোচনাকে একসঙ্গে নিয়ে তৈরি করেছে বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিসর। প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘নিনাসাম।’ নিনাসাম নামটি এসেছে শ্রী নীলাকান্তেশ্বর নাট্যসেবা সংঘ থেকে। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৯ সালে। তখন হেগ্গোডু ও তার আশেপাশের ছোট ছোট গ্রামের কিছু সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ দিনের কৃষিকাজ শেষ করে সন্ধ্যায় একত্রিত হতেন। সমসাময়িক বিষয় ও নানা ঘটনা নিয়ে আলোচনা, মাঝেমধ্যে নাটক মঞ্চস্থ করা কিংবা কোনো অতিথির বক্তব্য শোনা, সেই বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা -এসবই ছিল প্রাথমিক সাংস্কৃতিক পরিসরের চিত্র।


সেই অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডই ধীরে ধীরে ১৯৪৯ সালে একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। এই উদ্যোগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও পরবর্তী সময়ে এর প্রধান পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন কে. ভি. সুব্বন্না। মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি হেগ্গোডুতে ফিরে আসেন। তার নেতৃত্বে নিনাসামের কাজ স্থানীয় নাট্যচর্চার গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত হতে শুরু করে। রামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের নথি অনুযায়ী, নিনাসামের সংস্কৃতিতে শেকসপিয়র, মিলোরে ও বেঞ্চটের কন্নড় ভাষার নাট্যরূপ যুক্ত হয়। পাশাপাশি নতুন কন্নড় নাটক, শিশুদের জন্য নাটক এবং ভারতীয় ধ্রুপদি রচনার আধুনিক অভিযোজনও মঞ্চস্থ হতে থাকে। 


নিনাসামের যাত্রা নাটকেই থেমে থাকেনি। ১৯৬০ সালে এর প্রকাশনা শাখা আকসারা প্রতিষ্ঠিত হয়। নিনাসামের নিজস্ব ইতিহাসে এই প্রকাশনাকে নাটক ও সাহিত্যবিষয়ক বই প্রকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি থিয়েটার ও সাহিত্যকে ঘিরে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরির দিকে এগিয়ে যায়। এরপর আসে চলচ্চিত্র। নিনাসামের টাইমলাইম অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে নিনাসাম ফিল্ম সোসাইটি শুরু হয়। ১৯৭৭ সালে সেখানে প্রথম ফিল্ম ক্ল্যাসিক ফেস্টিভালস অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭৯ সালে শুরু হয় এন্যুয়াল ফিল্ম এপ্রেসিয়েশন কোর্স। অর্থাৎ চলচ্চিত্রকে শুধু বিনোদন হিসেবে দেখার পরিবর্তে চলচ্চিত্রের ভাষা, শিল্পমূল্য ও সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে বোঝাপড়ার একটি পরিসর তৈরি করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল গ্রামটির সাংস্কৃতিক জীবনে। 


রামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের নথি বলছে, নিনাসাম ১৯৭০ এর দশক থেকেই কর্ণাটকের দর্শকদের সামনে ক্ল্যাসিক ফিল্মস পরিচয় করাতে শুরু করে। পরবর্তীতে তাদের এন্যুয়াল ফিল্ম এপ্রেসিয়েশন কোর্সে সত্যজিৎ রায়, আকিরা কুরোসাওয়া এবং ইংমার বার্গম্যানের মতো চলচ্চিত্রকারদের কাজও প্রদর্শিত হয়েছে।


নিনাসামের ভাষায়, এই কাজের লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ কর্ণাটকের সঙ্গে বৃহত্তর বিশ্বের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে এমন একটি সাংস্কৃতিক পরীক্ষার অংশ হিসেবে বর্ণনা করে, যেখানে শিল্পচর্চা, শিক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং কমিউনিটির সম্পর্ককে একসঙ্গে ভাবা হয়। এই চিন্তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ পাওয়া যায় নিনাসামের কালচারাল কোর্সে।


২০১৫ সালের অফিশিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই আয়োজনে ফরমাল ও ইনফরমাল লার্নিং, থিওরি ও প্রাকটিস, এস্থেটিক ও ইনটেলিকচুয়াল চর্চাকে একত্র করার চেষ্টা করা হয়। একই জায়গায় স্কলার্স ও স্টুডেন্টস, আর্টিস্ট ও এক্টিভিটিস্ট বিশেষজ্ঞ সাধারণ আগ্রহী মানুষকে আলোচনায় যুক্ত করা হয়।

একটি কালচারাল কোর্সের এক দিনের কাঠামো দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। সকালে ও দিনে লেকচার ও ওপেন ডিসকাশন, আর্টিস্টের লেকচার ডেমোন্সট্রেশন, ইমফরমাল ইন্টারেকশন; সন্ধ্যায় থিয়েটার পারফর্ম্যান্স ও কালচারাল ফেস্টিভালস। আবার পরেরদিন সেই পারফর্ম্যান্স নিয়েও আলোচনা হতো। ২০১৫ সালের কোর্সে ছিল ১০টি লেকচার, ২টি লেকচার ডেমোন্সট্রেশন, ৫টি ওপেন-হাউস ডিসকাশন, ৭টি থিয়েটার পারফর্ম্যান্স, ১টি মিউজিক ডেমোন্সট্রেশন এবং ৫টি ইনফরমাল ডিসকাশন সেশন। 


এই আয়োজনের অংশগ্রহণকারীদের বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিনাসামের ২০১৭ সালের কালচারাল কোর্স রিপোর্ট বলছে, বিভিন্ন বয়স, শিক্ষা ও পেশাগত পটভূমির মানুষ এতে অংশ নেন। লেখক, শিল্পী, চিন্তক, এক্টিভিস্ট এবং বিভিন্ন ধরনের মানুষ এই সাংস্কৃতিক পরিসরে একত্রিত হন। 

এই দর্শনের আরেকটি বড় ধাপ ছিল নিনাসাম থিয়েটার ইন্সটিটিউট। ১৯৮০ সালে এটি শুরু হয়। র‌্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর প্রায় ১৫ জন শিক্ষার্থীকে থিয়েটার আর্টসের প্রশিক্ষণ দিতো। নিনাসামের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে এই ইন্সটিটিউট থেকে ৫০০’র বেশি প্রশিক্ষণার্থী বের হয়েছে, যাদের অনেকেই কন্নড় থিয়েটার, সাংবাদিকতা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছেন।

নিনাসামের প্রভাব কেবল হেগ্গোডুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। র‌্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের বিবরণে বলা হয়েছে, নিনাসামের সাফল্যের অনুপ্রেরণায় কর্ণাটকের অন্যান্য গ্রামীণ জেলাতেও স্থানীয় থিয়েটার কোম্পানি গড়ে উঠতে শুরু করে। এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার স্বীকৃতি আসে ১৯৯১ সালে। কে. ভি. সুব্বন্না পান র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফর জার্নালিজম, লিটারেচার অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ কমিউনিকেশন আর্টস। 


পুরস্কারদাতা সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ দক্ষিণ ভারতে আধুনিক নাটক ও চলচ্চিত্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি শিল্পের সর্বজনীনতার একটি শক্তিশালী উদাহরণ তৈরি করেছিলেন। তবে, সুব্বন্না নিজে এই সম্মানকে একক ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখেননি। তার ম্যাগসাইসাই এক্সেপ্টেন্স স্পিচে তিনি বলেছিলেন, পুরস্কারটি তার পাশাপাশি নিনাসাম ইন্সটিটিউশন্স, আকসারা পাবলিকেশন্স, তার গ্রাম হেগ্গোডু এবং কর্ণাটকেরও সম্মান।

এই বক্তব্যটি হেগ্গোডুর গল্প বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিনাসামের সাফল্য কোনো একক শিল্পীর প্রতিভার গল্প নয়। এটি একটি কমিউনিটিরর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের গল্প। একটি ছোট গ্রামে ১৯৪৯ সালে শুরু হওয়া একটি ছোট থিয়েটার গ্রুপ আজ এমন একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যার কাজের পরিধি নাট্যমঞ্চ থেকে চলচ্চিত্র, সাহিত্য থেকে শিক্ষা, স্থানীয় কমিউনিটি থেকে বৃহত্তর বিশ্বের দিকে বিস্তৃত। একটি গ্রামের সন্ধ্যা থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার সামনে ধীরে ধীরে খুলে গিয়েছে একটি বৃহত্তর পৃথিবী। আর সেই পৃথিবীর দিকে তাকানোর জন্য হেগ্গোডুকে নিজের গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে হয়নি, তারা নিজেদের গ্রামেই একটি বড় জানালা তৈরি করেছে।

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   শেক্সপিয়র  হেমিংওয়ে  কালিদাস  কৃষক  কর্ণাটক  হেগ্গোডু  সংস্কৃতি  ঐতিহ্য  গ্রাম 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: