গরমে, ব্যায়ামের পর কিংবা বেশি লবণাক্ত খাবার খেলে তৃষ্ণা পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু পর্যাপ্ত পানি পান করার পরও যদি বারবার তৃষ্ণা পেতে থাকে, বিষয়টি অবহেলা করার মতো নয়। কারণ, অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী তৃষ্ণা কখনো কখনো শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অতিরিক্ত ও বারবার তৃষ্ণা পাওয়াকে ‘পলিডিপসিয়া’ বলা হয়। এর পেছনে সাধারণ কিছু কারণ যেমন থাকতে পারে, তেমনি কিছু শারীরিক সমস্যাও এর জন্য দায়ী হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে এমনটা হলে কারণটি খুঁজে দেখা জরুরি।
কেন বারবার তৃষ্ণা পায়?
মুম্বাইয়ের পিডি হিন্দুজা হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের কনসালট্যান্ট নেফ্রোলজিস্ট ও ট্রান্সপ্ল্যান্ট ফিজিশিয়ান ডা. অয়ন কুমার দে বলেন, অতিরিক্ত তৃষ্ণার পেছনে বেশির ভাগ সময়ই কোনো না কোনো নির্দিষ্ট কারণ থাকে।
পরিবেশের তুলনায় শরীরে পর্যাপ্ত পানি না পৌঁছানো এর সবচেয়ে সাধারণ কারণ। বাইরে দীর্ঘ সময় কাজ করা, শুষ্ক পরিবেশে থাকা কিংবা নিয়মিত ব্যায়াম করলে ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে যে পরিমাণ তরল বেরিয়ে যায়, অনেক সময় তা ঠিকভাবে পূরণ করা হয় না। ফলে তৃষ্ণা বাড়তে পারে।
কিছু ওষুধও মুখ শুকিয়ে দিতে পারে বা শরীর থেকে তরল বের হওয়ার পরিমাণ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে পানি নিঃসরণ বাড়ায় এমন ওষুধ, উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ, অ্যান্টিহিস্টামিন এবং মানসিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধের কারণে এমনটা হতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তনেও বাড়তে পারে তৃষ্ণা
হরমোনের ওঠানামাও শরীরের পানির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সার্টিফায়েড মেনোপজ কোচ ও মেনোভেডার সহপ্রতিষ্ঠাতা তামান্না সিংয়ের মতে, বিশেষ করে ইস্ট্রোজেনের মাত্রার পরিবর্তন শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে পর্যাপ্ত পানি পান করার পরও বারবার তৃষ্ণা লাগতে পারে।
রক্তে শর্করা বেড়ে গেলেও এমন হতে পারে
অতিরিক্ত তৃষ্ণার অন্যতম কারণ হতে পারে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া। রক্তে শর্করা বেশি থাকলে শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এতে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়ে এবং শরীর থেকে বেশি পানি বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে ঘন ঘন তৃষ্ণা পেতে থাকে।
এ কারণে অতিরিক্ত তৃষ্ণার সঙ্গে যদি ঘন ঘন প্রস্রাব, দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ক্ষুধার মতো উপসর্গও থাকে, তাহলে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।
ঘুমের ঘাটতিও একটি কারণ
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া এবং রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়াও শরীরের তরলের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুমের মধ্যে শরীর থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি বেরিয়ে গেলে সকালে বা পরদিন তীব্র তৃষ্ণা অনুভূত হতে পারে।
চা-কফি ও লবণাক্ত খাবার
খাবারের অভ্যাসের সঙ্গেও অতিরিক্ত তৃষ্ণার সম্পর্ক রয়েছে। বেশি লবণযুক্ত খাবার শরীরের পানির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের কারণেও কারও কারও তৃষ্ণা বাড়তে পারে।
চা, কফি কিংবা লবণাক্ত নাশতা বেশি খাওয়ার পর তাই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পানি পানের প্রয়োজন হতে পারে।
কিডনির সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে
কিডনি শরীরের তরল ও বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডা. অয়ন কুমার দের মতে, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে কিডনির প্রস্রাব ঘন করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এতে শরীরের তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে বেশি পানি প্রয়োজন হতে পারে এবং তৃষ্ণা বাড়তে পারে।
এ ছাড়া রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, লালাগ্রন্থির কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে এমন কিছু রোগ, যেমন সজোগ্রেন সিনড্রোম, কিংবা নাকের সমস্যার কারণে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস থেকেও মুখ শুকিয়ে যেতে পারে। অনেক সময় এই শুষ্কতাকেই অতিরিক্ত তৃষ্ণা হিসেবে মনে হয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
গরমে থাকা, ব্যায়াম করা বা লবণাক্ত খাবার খাওয়ার পর তৃষ্ণা পাওয়া নিয়ে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তবে পর্যাপ্ত পানি পান করার পরও যদি দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক তৃষ্ণা অনুভূত হয় এবং এর কোনো স্পষ্ট কারণ না থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
বিশেষ করে অতিরিক্ত তৃষ্ণার সঙ্গে ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, ওজনের পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। কারণ, তৃষ্ণা নিজে কোনো রোগ নয়; বরং কখনো কখনো এটি শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার একটি সংকেত হতে পারে।
সময়ের আলো/জেডি