স্বচ্ছতা ও দক্ষ বাস্তবায়নে আসবে সাফল্য

ব্রিগে. জেনা. মো. জাহেদুর রহমান (অব.)

মতামত

স্বাধীনতার পর থেকেই দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে পরিচালনা করে আসছে।

2026-07-25T21:59:28+00:00
2026-07-25T21:59:28+00:00
 
  শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
বাংলাদেশের নতুন সামাজিক সুরক্ষা স্থাপত্য
স্বচ্ছতা ও দক্ষ বাস্তবায়নে আসবে সাফল্য
ব্রিগে. জেনা. মো. জাহেদুর রহমান (অব.)
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
স্বাধীনতার পর থেকেই দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে পরিচালনা করে আসছে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত অসংখ্য কর্মসূচি বাস্তবে উদ্দিষ্ট পরিবর্তন ঘটাতে সফল হয়নি। উপকারভোগী নির্বাচনে অসামঞ্জস্যতা, তথ্যের পুনরাবৃত্তি, সমন্বয়ের অভাব এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের কারণে এই ব্যবস্থা কাক্সিক্ষত ফল দিতে পারেনিই বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর বিএনপি সরকার যে ঘবি New Social Protection Architecture বা নতুন সামাজিক সুরক্ষা স্থাপত্য উপস্থাপন করেছে, তা কেবল একটি নতুন ভাতা কর্মসূচি নয়; বরং সামাজিক সুরক্ষার দর্শন, তথ্যব্যবস্থা এবং সেবা দেওয়ার পদ্ধতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা।

প্রথম যে গুণগত পরিবর্তন হয়েছে সেটি হলো ব্যক্তি থেকে পরিবার : দর্শনের পরিবর্তন। অতীতে অধিকাংশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল। যেমন- বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, পঙ্গু ভাতা ইত্যাদি। নতুন দর্শনের মূল ভিত্তি হলো- পরিবারই উন্নয়নের মৌলিক একক। নতুন ব্যবস্থায় পুরো পরিবারকে একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ধারণার ভিত্তিতে চালু হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। 

এটা শুধু নগদ অর্থ সহায়তা নয়; ভবিষ্যতে একটি পরিবারের জন্য সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সেবায় প্রবেশের একক পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করবে। ফ্যামিলি কার্ড বস্তুত ভবিষ্যতের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে নির্বাচিত নিম্ন আয়ের পরিবারকে মাসিক নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। 

কার্ডটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করা হচ্ছে এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সরাসরি টাকা দেওয়া হচ্ছে। কর্মসূচির ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে একই কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য ভর্তুকি, শিক্ষা উপবৃত্তি, কৃষি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে একত্রিত করা।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে খণ্ডিত কর্মসূচি থেকে সমন্বিত ব্যবস্থায় উত্তরন। বাংলাদেশে বহু বছর ধরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে অসংখ্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালিত হয়ে আসছে। নতুন নীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো একটি ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি ও ফ্যামিলি ট্রি তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা, যাতে একই ব্যক্তি বা পরিবারের একাধিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমে, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় এবং প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যায়। ভবিষ্যতে একটি একক ডিজিটাল পরিচয় ও কিউআরভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সেবা সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাবগুলো বিশ্লেষণের দাবি রাখে। যদি পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা হলে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। প্রথমত দারিদ্র্য বিমোচনে অধিক কার্যকারিতা অর্জিত হতে পারে। একই পরিবারের আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে একসঙ্গে বিবেচনা করার ফলে নীতিনির্ধারণ আরও বাস্তবসম্মত হবে। 

দ্বিতীয়ত নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়তে পারে। পরিবারের নারীপ্রধানের নামে কার্ড ইস্যু এবং সরাসরি অর্থ প্রদান পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তৃতীয়ত ডিজিটাল গভর্ন্যান্স আরও শক্তিশালী হবে। মধ্যস্বত্বভোগী কমবে, অর্থ বিতরণে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগ সীমিত হতে পারে। চতুর্থত প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ সহজ হবে। 

জাতীয় পর্যায়ে হালনাগাদ সামাজিক তথ্যভান্ডার থাকলে দুর্যোগ, মূল্যস্ফীতি বা অর্থনৈতিক সংকটের সময় দ্রুত লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। পঞ্চমত মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়বে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও কৃষি সহায়তাকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার মাধ্যমে দারিদ্র্যের বংশ পরম্পরা চক্র ভাঙার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।

তবে এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ বাস্তবায়নে কয়েকটি বড় অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আর্থিক সক্ষমতা। কয়েক কোটি পরিবারকে নিয়মিত নগদ সহায়তা দেওয়া এবং সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বাজেটিয় সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। 

সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও এর অর্থায়ন, রাজস্ব আহরণ এবং ব্যয়ের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হবে। দ্বিতীয়ত তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে হবে। ভুল তথ্য, বাদ পড়া প্রকৃত দরিদ্র পরিবার, অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি অথবা সুবিধাভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। 

তৃতীয়ত ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৃহৎ ডিজিটাল সামাজিক তথ্যভান্ডার পরিচালনার ক্ষেত্রে শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং জবাবদিহিতা অপরিহার্য। চতুর্থত প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করা সহজ হবে না। বহু মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এই উদ্যোগের সফলতার অন্যতম পূর্বশর্ত।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন- ব্রাজিলের বোলসা ফ্যামিলিয়া, মেক্সিকোর প্রোসপেরা। ইউরোপীয় অনেক দেশেও এমন ব্যবস্থা রয়েছে। এসব দেশের সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা দেখিয়েছে যে, একটি একক সামাজিক নিবন্ধনভিত্তিক ডিজিটাল কাঠামো দারিদ্র্য হ্রাস, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে কার্যকর হতে পারে। বাংলাদেশের নতুন সামাজিক সুরক্ষা স্থাপত্যকেও সেই ধরনের একটি আধুনিক মডেলের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। যদিও এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের মানের ওপর।

বাংলাদেশের নতুন সামাজিক সুরক্ষা স্থাপত্য মূলত একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ধারণা বহন করে, যেখানে বিচ্ছিন্ন ভাতা কর্মসূচির পরিবর্তে সমন্বিত, ডিজিটাল, পরিবারভিত্তিক এবং তথ্যনির্ভর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি দেশের সামাজিক নীতি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে যদি সুবিধাভোগী নির্বাচন, তথ্য ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন বা প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ে দুর্বলতা থেকে যায়, তা হলে এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে। ফলে, এই নতুন সামাজিক সুরক্ষা স্থাপত্যের সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড হবে এর ঘোষিত লক্ষ্য নয়, বরং মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছ, দক্ষ ও টেকসই বাস্তবায়ন।

লেখক : ডিরেক্টর জেনারেল, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ 

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   স্বচ্ছতা  দক্ষ বাস্তবায়ন  সাফল্য  বাংলাদেশ  সামাজিক সুরক্ষা 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: