জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ করে ঘটেনি; দীর্ঘদিনের বৈষম্য, শোষণ, অন্যায় এবং জনগণের প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করার ধারাবাহিকতার ফলই ছিল এই গণঅভ্যুত্থান। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় জনগণের অধিকার হরণ করে কোনো শাসক দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না।
রোববার (২৬ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান অনুষদের কনফারেন্স কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪: ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উপাচার্য বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতা একই শিক্ষা দেয়-ন্যায়বিচার ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করলে তার পরিণতি অনিবার্য।
তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণআন্দোলনের দাবিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হলে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি নাও হতে পারত। তবে ছাত্র-জনতা, অভিভাবক এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই আন্দোলনটি গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয় এবং সফলতা অর্জন করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন উপাচার্য। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জুলাইয়ের চেতনাকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না; বরং প্রতিটি কর্মকাণ্ডে বৈষম্যবিরোধী ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আদর্শকে ধারণ করতে চায়।
তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। জুলাই যোদ্ধা শিক্ষার্থীদের প্রথম সেমিস্টারের টিউশন ফি মওকুফ করা হয়েছে। আগামী ৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জুলাইয়ের গ্রাফিতি সংরক্ষণ, স্মারক কর্নার স্থাপন এবং এ-সংক্রান্ত আরও বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের স্বৈরাচার, বৈষম্য, অন্যায় ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ফল। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই গণঅভ্যুত্থান সফল হয় এবং জনগণের বিজয় নিশ্চিত হয়।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো কোনো রাষ্ট্র বা সরকার যেন আর কখনো বৈষম্য, নিপীড়ন ও অবিচারের পথে না হাঁটে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এখন সবার প্রধান দায়িত্ব।
অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সাহস, ত্যাগ ও আত্মদানের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস শুধু স্মরণ করলেই হবে না; এর চেতনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ন্যায়বিচার, সমতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি জানান, আগামী ৫ আগস্ট ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করা হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে প্রতিবছর ১৪ জুলাই উইমেন্স ডে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই কর্নার’ স্থাপন, সেমিনারের প্রবন্ধ ও বক্তব্য সংকলন প্রকাশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/আরবিএন