জন্ম তার বগুড়ায়। কিন্তু ১০ বছর বয়স থেকে ঢাকায় বসবাস। তাও আবার পুরান ঢাকা নাজিরাবাজারে। ছেলেবেলা থেকেই গানের সুর কানে ভেসে আসত। আর সুরের ভেলায় চড়ে সংগীত ভুবনে আসার পথ দেখিয়েছেন শিল্পীর চাচা ডা. আবু হায়দার সাজেদুর রহমান। যিনি ছিলেন ঢাকা ডেন্টাল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও সাংস্কৃতিক জগতের এক উজ্জ্বল নাম। তিনি রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। শুধু তাই নয়, তার একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল।
ডা. আবু হায়দার সাজেদুর রহমানের ভাতিজা হলেন আজকের সবার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয় শিল্পী মো. খুরশীদ আলম। ১৯৬২-৬৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক গানের প্রতিযোগিতায় খুরশীদ আলম অংশগ্রহণ করেন। সেই প্রতিযোগিতায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। সে সময় শিল্পী সবেমাত্র নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। তবে তার গানের ব্যাপারে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শেখ আবুল ফজল আন্তরিক সহযোগিতা করেছেন।
শিল্পী হিসেবে খুরশীদ আলম হতে পারতেন একজন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। কিন্তু সে সময়ের পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে তা আর সম্ভব হয়নি।
শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ ১৯৬৫ সালে। নাজিমউদ্দিন রোডের সেই ঢাকা বেতার কেন্দ্রে। তবে সে সময় সরকার রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার কারণে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া আর হয়নি। কিন্তু যার মনে সুর বাজে, যার প্রাণে সুরের প্রতিধ্বনি তিনি কী আর সুরের জগৎ ছেড়ে থাকতে পারেন?
কোনো এক দিন শাহবাগের বেতার কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ হলো। যখন সে বেতারে গান গেয়ে চলেছেন আজকের কিংবদন্তি শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী, মো. আব্দুল জাব্বার, মো. আলী সিদ্দিকী। সে সময় তার মনের সুপ্ত বাসনা পূরণের জন্য কতই না সাধনা। এক দিন মো. আবদুল জাব্বারের সঙ্গে টাঙ্গাইলের করটিয়া কলেজে যাওয়ার সুযোগ হলো। সেই কলেজের অনুষ্ঠানে অগণিত দর্শকদের সামনে গাওয়ার সুবর্ণ মহেন্দ্রক্ষণ এলো। একের পর এক হেমন্ত মুখোপাধ্যয়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যয়, কিশোর কুমারসহ আরও বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে গান গাইলেন খুরশীদ আলম। গানের সঙ্গে একদিকে যেমন করতালি, অন্যদিকে দর্শক-শ্রোতাদের কাছ থেকে একের পর এক অনুরোধ। সে সময়ের ইংরেজি পত্রিকায় পরদিন ছবিসহ বড় প্রতিবেদন ছাপা হলো।
সেই থেকে আবিষ্কার হলো একজন মো. খুরশীদ আলমের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক বিরাট সম্ভাবনার শিল্পীর অঙ্কুর। তবে শিল্পীকে রেডিওতে গান গাওয়ার ব্যাপারে আন্তরিকতা দেখিয়েছিলেন আরেক বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী খন্দকার ফারুক আহমেদ। বেতারে গান গাওয়ার জন্য অডিশন দেওয়ার নিয়ম ছিল। সেই অডিশন বোর্ডে ছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমান, বিখ্যাত সুরকার আবদুল আহাদ ও আরেক বিখ্যাত সুরকার সমর দাস। অডিশন বোর্ডে খুরশীদ আলমের কণ্ঠ শুনে শুধু আশ্চর্য হননি। আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন কণ্ঠে তার এক ধরনের বৈচিত্র্য রয়েছে।
আজকের এই বিখ্যাত শিল্পী মো. খুরশীদ আলমকে এ পর্যায়ে আসতে অনেক সাধনা করতে হয়েছে। তিনি সরকারি সংগীত কলেজে যেমন ভর্তি হয়ে নিজের সাধ্যমতো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তেমনি জগন্নাথ কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক অজিত কুমার গুহর কাছে উচ্চারণের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান রেডিওতে প্রথমবারের মতো গান গাইতে শুরু করেন। সেই যে পথচলা আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বেশ কয়েকজন সুরকার ও সংগীত পরিচালকের দৃষ্টিতে খুরশীদ আলম হয়ে উঠলেন হঠাৎ আলোর ঝলকানি মতো এক ভিন্ন মাপের শিল্পী। রেডিওতে গাইলেন আজাদ রহমানের সুরে চঞ্চলা দুই নয়নে বলো না খুঁজছ/ তোমার দু’হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম।
তবে সে সময় রেডিওতে তিনি আরও কিছু আধুনিক গান গেয়েছেন যা এখন সচরাচর শোনা যায় না। এর মধ্যে রয়েছে আলতো পায়ে ছন্দ তুলে গায়ের বধূ যায়/ আমার তানপুরাটা তারগুলো নিমন্ত্রণের সুর ছড়াল প্রাণে/ আমি নিজের মন জানি শুধু/। এ ধরনের আরও অনেক গান মনের বীণায় আজও শ্রোতা মনে দোলা দেয়।
১৯৬৯ সালে খুরশীদ আলমের জীবনে এক আশ্চর্য প্রদীপ জে¦লে এগিয়ে এলেন বিখ্যাত সুরকার আজাদ রহমান। যিনি নিজেই ছবিতে গান গেয়েছেন। যার কণ্ঠে দীপ্ত রয়েছে চাঞ্চল্য ও তারুণ্য। সেই শিল্পী প্রথম ছবিতে গাইলেন দুঃখের গান। যে গানের কলি হচ্ছে ‘বন্দি পাখির মতো মনটা কেঁদে মরে’।
শিল্পী খুরশীদ আলমের কণ্ঠে চঞ্চলতার ছোঁয়া পাওয়া যায় বিভিন্ন ছবির গানে। এর মধ্যে রয়েছে ডিম ডিম ডিম মারো আরো জোরে মারো/ মাগো মা ওগো মা আমারে বানাইলি দিওয়ানা/ চুমকি চলেছে একা পথে/ পাখির বাসার মতো দুটি চোখ/ চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে/ যদি বউ সাজো গো/ আজকে না হয় ভালোবাসো/ বাপের চোখের মণি/ চুরি করেছ আমার মনটা/ ইত্যাদি। এ ধরনের অসংখ্য গান রয়েছে যা শ্রোতা মনে এখনও আন্দোলিত করে।
শুধু একক গান নয়, তিনি দ্বৈতকণ্ঠে কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা. সাবিনা ইয়াসমিন, শাম্মী আখতার, সৈয়দ আব্দুল হাদী, মো. আবদুল জাব্বার, সুবীর নন্দীসহ আরও বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গেও গান গেয়েছেন।
একবার নায়ক রাজ রাজ্জাক শিল্পী খুরশীদ আলমকে অফার দিয়েছিলেন ছবিতে ছোট ভাই হিসেবে অভিনয় করার জন্য। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেছেন, আমি গান নিয়েই থাকতে চাই। শিল্পী আসলে গান নিয়েই আছেন। যে কারণে এই বয়সেও তারুণ্যের দীপ্তি কণ্ঠে ছড়িয়ে রয়েছে।
২০১৮ সালে একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার পাওয়া শিল্পী মো. খুরশীদ আলমের জন্মদিন ১ আগস্ট। তিনি এই জন্মদিন নিয়ে একটি গান গেয়েছিলেন। আর তা হলো ‘জন্মদিনে বলতে এলাম শুভ তোমার জয়ন্তী/হাসির উপহারে ভরে তোলো নয়নটি’।
আলাপচারিতায় উঠে এসেছে সে সময় একটি গান রেকর্ডিং করার জন্য কত সময় রিহার্সেল করতে হতো। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ ছবির গানের জন্য আমাকে সংগীত পরিচালক আলী হোসেন সাহেব ‘ও দুটি নয়নে’ গানটির জন্য বেশ সময় লেগেছে। যতক্ষণ না তার মনের মতো না হচ্ছে ততক্ষণ আমাকে গাইতে হয়েছে। সে সময় সুরকাররা কণ্ঠশিল্পীর কণ্ঠের ধরন দেখে শিল্পী চয়েজ করতেন। আর সবচেয়ে বড় কথা গানের ক্ষেত্রে সবার আন্তরিকতা ছিল। একেবারে গীতিকার থেকে শুরু করে সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীর।
শিল্পী খুরশীদ আলম কথা প্রসঙ্গে অনেক বিখ্যাত সুরকার ও গীতিকারদের নাম উল্লেখ করেন। যারা আজ পৃথিবীতে না থাকলেও তাদের সৃৃষ্টি অমর হয়ে থাকবে। অমরত্বের প্রধান কারণ হচ্ছে, গানের বাণী ও সুর। জন্মদিনকে সামনে রেখে সময়ের আলোর পক্ষ থেকে আগাম শুভ জন্মদিন ও অভিনন্দন রইল।
সময়ের আলো/আরবিএন/প্রিন্ট