যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছিল সৌদি আরব। তবে একাধিক দিক থেকে হামলার মুখে পড়ে এবার কৌশল বদলাতে বাধ্য হচ্ছে রিয়াদ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালানোর পর প্রশ্ন উঠেছে, সৌদি আরব কি আরও কঠোর সামরিক জবাব দেবে, নাকি উত্তেজনা কমানোর পথ খুঁজবে।
বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে সৌদি আরব সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির ওপর ড্রোন হামলা বেড়ে যাওয়ায় রিয়াদ অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
সৌদি আরবের বিশ্বাস, ইরান-সমর্থিত ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) অন্তত ৩০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর জবাব হিসেবে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ হামলা চালায় সৌদি বাহিনী।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংঘাতের একপক্ষে রয়েছে ইরান ও দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের মিত্রদের মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ।
অন্যদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম), উপসাগরীয় কয়েকটি আরব দেশ, জর্ডান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল।
সম্প্রতি ইরান জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নতুন নিয়ম না মানা বাণিজ্যিক জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি যুবরাজ ও কার্যত দেশটির শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির মাধ্যমে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক শিল্প, প্রযুক্তি ও বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে চান।
এই পরিকল্পনার আওতায় ডেটা সেন্টার, শিল্পাঞ্চল ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এসব স্থাপনা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে বিদেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় ভয়াবহ ড্রোন হামলা হয়েছিল। এতে কয়েক দিনের জন্য দেশটির প্রায় অর্ধেক তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়।
সর্বশেষ গত সোমবার প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, আবকাইক তেল স্থাপনায় আবারও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর ড্রোন হামলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এই জলপথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলের ইয়ানবু বন্দরে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পাঠিয়ে রপ্তানি অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে।
তবে নতুন করে আরেকটি সংকট তৈরি হয়েছে লোহিত সাগরে। গত ১৩ জুলাই সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার সানার বিমানবন্দরে হামলা চালানোর পর হুথিরা আবহা ও জিজান বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
এর পাশাপাশি লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজেও হামলা শুরু করেছে হুথিরা। ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, যা এশিয়ার বাজারে সৌদি তেল রপ্তানিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সৌদি আরব সাত বছর ধরে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েও তাদের দমন করতে পারেনি। ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলেও বর্তমানে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। ফলে দক্ষিণে ইয়েমেন থেকে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং উত্তরে ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর আক্রমণের মুখে পড়েছে সৌদি আরব।
সূত্র: বিবিসি
সময়ের আলো/কেএইচ