ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে আবারও বড় পরিসরে যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রদের অনাগ্রহ এবং ইয়েমেনে নির্ভরযোগ্য স্থানীয় বাহিনীর সীমাবদ্ধতার কারণে হুথিদের মোকাবিলায় রিয়াদের হাতে এখন খুব বেশি বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেও কয়েক মাস ধরে সৌদি আরব তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। ইরানঘনিষ্ঠ ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন অচল হয়ে গেছে। একই সময়ে হুথিরা সৌদি শহরগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এমনকি মক্কার আকাশেও একটি হুথি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুথিরা।
এতে সৌদি আরব এক ধরনের দুই-মুখী সংকটে পড়েছে। একদিকে ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে রিয়াদকে। এর মধ্যে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্তরের সরবরাহও বিশ্বব্যাপী কমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রও হুথিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র হুথি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি সৌদি আরবের নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদার তুরস্ক ও পাকিস্তানও হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সৌদি আরব ও তুরস্ক-পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা চুক্তির আওতায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকলেও ইয়েমেনের বর্তমান সংঘাতে তাদের সরাসরি ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
চ্যাথাম হাউসের উপসাগরীয় বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিল কুইলিয়াম বলেন, সৌদি আরব বর্তমানে বড় ধরনের সংকটে রয়েছে এবং অনেকটাই একা। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র পাশে নেই এবং মক্কা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোও এগিয়ে আসেনি। ফলে সৌদি আরবের হাতে বিকল্প সীমিত।
হুতিদের অগ্রযাত্রায় লোহিত সাগরের উপকূলের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা এশিয়ায় সৌদি তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। একই সঙ্গে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার কারণে ইউরোপে সৌদি তেল সরবরাহও ঝুঁকিতে পড়েছে।
হুতিরা এখন ইয়েমেনের তাইজ ও মারিব শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি শহর হুথিদের নিয়ন্ত্রণে গেলে সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার বড় ধরনের চাপে পড়বে।
স্থলযুদ্ধে সেনা পাঠাতে আগ্রহী নয় সৌদি আরব। দেশটির হাতে ইয়েমেনে নির্ভরযোগ্য স্থানীয় মিত্রও খুব বেশি নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থন পাওয়া ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে হুতিদের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করতে সক্ষম স্থানীয় বাহিনীগুলোর মধ্যে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল অন্যতম। তবে তারা স্বাধীন দক্ষিণ ইয়েমেন রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে।
হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের তেল খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মঙ্গলবার ইউরোপে কয়েকটি তেল চালান বাতিল করেছে সৌদি আরব। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের শেষ প্রান্তে থাকা লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল ওঠানোও স্থগিত রয়েছে।
এই পরিস্থিতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনাকেও চাপে ফেলতে পারে। তেলনির্ভরতা কমিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। আগামী মাসে সৌদি আরবে বড় একটি বিনিয়োগ সম্মেলনও হওয়ার কথা।
তবে এক দশক আগের মতো আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না সৌদি আরব। ২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। এরপর থেকে ইয়েমেনে সংঘাত অনেকটাই স্থবির অবস্থায় ছিল। দীর্ঘ আট বছরের সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা থেকে সৌদি নীতিনির্ধারকেরা এবার আরও সতর্ক বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
রিয়াদের নায়েফ আরব ইউনিভার্সিটি ফর সিকিউরিটি সায়েন্সেসের কর্মকর্তা হিশাম আলগান্নাম বলেন, আবার পূর্ণমাত্রার স্থলযুদ্ধে ফিরলে আগের আট বছরের অভিযানের তুলনায় খুব বেশি অর্জনের সুযোগ নেই। বরং এতে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সামনে একটি সম্ভাব্য পথ হলো সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত সামরিক চাপ বাড়ানো এবং একই সঙ্গে হুতিদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করা। তবে হুতিদের শর্ত মেনে নেওয়াও রিয়াদের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্নার্ড হেইকেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা ছাড়া কতটা সামরিকভাবে জড়াবে, তা নিয়ে সৌদি আরবের দ্বিধা ছিল। সেই দ্বিধার কারণে কিছু ভূখণ্ড হারাতে হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
সময়ের আলো/কেএইচ