নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চর আতাউর এলাকায় সরকারি খাসজমি দখল, সংরক্ষিত বনভূমি উজাড়, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ আমলে নিয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরগুলোকে তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৮ জুলাই) বিকেলে হাতিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল কাদের এ আদেশ প্রদান করেন। আগামী ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, চর আতাউর এলাকায় সংঘটিত ঘটনাগুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন জনমনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে তা সরকারি সম্পত্তি দখল, বনভূমি বিনষ্ট এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে। বিষয়টি জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় ঘটনার নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে আদালত মত দেন।
চর আতাউর। ছবি : সময়ের আলো
আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে চর আতাউরের পাশে চর জাগলা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর নতুন করে দখলচেষ্টার অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রকৃত অবস্থা নিরূপণে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৯০(১)(গ) ধারা অনুযায়ী হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য হাতিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), হাতিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কন্টিনজেন্ট কমান্ডার, উপকূলীয় বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে বলা হয়েছে।
আদালত তদন্ত প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে চর আতাউরের ভূমি সরকারি খাসজমি কি না, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে জমি দখল করেছে কি না, সেখানে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, মাটি কাটা বা ভরাটের ঘটনা ঘটেছে কি না, সরকারি গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনভূমি দখল বা বৃক্ষ নিধন করা হয়েছে কি না এবং হরিণসহ বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা অবৈধ শিকার বা পাচারের ঘটনা ঘটেছে কি না।
আদেশে বলা হয়েছে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তা ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এবং সংশোধিত বন আইন, ১৯২৭ সহ প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তদন্ত কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ, সাক্ষীদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের পরিচয় ও ঠিকানাসহ পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনার অনুলিপি পাওয়ার পরই তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তদন্তে প্রয়োজনীয় সব সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আদালতে দাখিল করা হবে।’
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের এ আদেশকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন প্রভাবশালী গ্রুপ চর আতাউরসহ আশপাশের চরাঞ্চলে দখল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এসব ব্যক্তি নতুন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে দখল কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ফলে, প্রভাবের কারণে অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।
স্থানীয়দের আশা, আদালতের নির্দেশে পরিচালিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দখলদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ পাবে। একইসঙ্গে সরকারি খাসজমি, সংরক্ষিত বনভূমি ও চরাঞ্চল অবৈধ দখলমুক্ত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পথ সুগম হবে। তারা চরাঞ্চলের সরকারি সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপও প্রত্যাশা করেন।