ইতিহাস বলে ইরান ও সৌদি আরবের দ্বন্দ্ব শত শত বছরের। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো যখন ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের রণক্লান্ত রূপ ক্রমশ তুলে ধরছে, তখন সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী আঞ্চলিক মিত্র সৌদি আরবের জড়িয়ে পড়ার খবর এলো। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে, ‘যে যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রাণপণ চেষ্টা করছে সৌদি আরব, সেই যুদ্ধেই দেশটিকে টেনে নেওয়া হচ্ছে।’
এতে বলা হয়, গত ৫ মাস ধরে সৌদি আরব আঞ্চলিক সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। তেহরান প্রতিবেশী দেশটির তেলশিল্পে ক্রমাগত ড্রোন হামলা করার পর রিয়াদ কূটনৈতিক উপায়ে সংঘর্ষ বন্ধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়, তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরবকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে।
একদিকে যুদ্ধরত ইরান তো আছেই, অন্যদিকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র সৌদি আরবকে অপর প্রতিবেশী ইরাক ও ইয়েমেন থেকে চাপে ফেলেছে। এতে আরও জানানো হয় ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও ইরাক সমর্থিত মিলিশিয়ারা সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে। উপরন্তু, তেহরানের তরফ থেকে নতুন করে প্রতিবেশী দেশগুলোয় হামলার হুমকি তো আছেই।
কিন্তু ‘এর ফলাফল যে ভালো হবে না’ সে কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে একটি ক্রমবর্ধমান সংঘাতে জড়িয়ে পড়া রিয়াদের জন্য যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অনেক ব্যয়বহুল। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় রিয়াদ-তেহরানের শান্তি চুক্তির কথাও প্রতিবেদনটিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সেই ‘রিয়াদের যুদ্ধে না জড়ানোর কৌশল এখন লাইফ সাপোর্টে’ বলেও এতে মন্তব্য করা হয়। কেননা সৌদি আরব এখন ঝড়ের মুখে। তিন দিকে শত্রুর অবস্থান সৌদি সরকারের জন্য দুঃস্বপ্নের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনটি থেকে আরও জানা যায়, সম্প্রতি সৌদি আরব নিজেদের সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করতে ১০ বিলিয়ন ডলারের খরচ করেছে। নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে। সৌদি আরবের আয়তন ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯০ বর্গকিলোমিটার। দেশটি বাংলাদেশের প্রায় ১৫ গুণ বড়। অন্যদিকে ইরানের আয়তন ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯৫ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ ভৌগোলিক দিক থেকে সৌদি আরব ‘চির শত্রু’ ইরানের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৩ গুণ বড়।
সম্প্রতি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জিসিসি জোটের সেনাবাহিনীরা বাহরাইনে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে। বাহরাইনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ জুলাই শুরু হওয়া ‘বাহরাইন শিল্ড’ নামের তিন দিনের সেই মহড়ার মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ প্রস্তুতি। এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ পরিকল্পনা ও সমন্বয় বাড়াতে সহযোগিতা করবে বলে আশা করেন বাহরাইনের চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ধিয়াব বিন সাকর আল-নুয়াইমি।
এই সামরিক কর্মকর্তা মনে করেন, জিসিসি সদস্যদের সামরিক মহড়া কৌশলগত ঐক্যের ভিত্তি গড়ার পাশাপাশি বহিঃশত্রুর যেকোনো ধরনের হামলার বিরুদ্ধে এক হওয়ার বার্তা দিয়েছে। শত্রুর হামলার কারণে আরব দেশগুলোর মধ্যে একতা সৃষ্টি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন বাহরাইনের চিফ অব স্টাফ। উপসাগর সহযোগিতা সংস্থা বা জিসিসির সদস্য দেশগুলো হচ্ছে বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান ও কাতার।
চলমান ইরানে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এসব দেশের সদ্য সমাপ্ত সামরিক মহড়া সম্পর্কে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমগুলো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তবে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, প্রতিবেশী ইরানের ক্রমাগত হামলার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলো নিজেদের বিদ্যমান মতভেদ ভুলে এবার সত্যি সত্যি এক হওয়ার চেষ্টা করবে। ইরানের হামলা থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য আরব দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি বলেও মনে করেন অনেকে।
একদিকে যখন ইরানের হামলা থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য আরব দেশগুলোর ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধনী দেশ সৌদি আরবের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা দোটানার কথাও প্রচারিত হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার বিবিসির এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে চাওয়া সৌদি আরবের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব’। প্রতিবেদন অনুসারে সৌদি আরব ভীষণ কঠিনভাবে দোটানায় পড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আচমকা ইরানে হামলার চালানোর পর থেকে সৌদি আরব এই সংঘাতের বাইরে থাকতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এতে জানানো হয়, সৌদি আরবের ওপর ইরান-ইরাক-ইয়েমেন তথা তিন দিক থেকে হামলা হওয়ার পরও রিয়াদের দোটানাভাব কাটছে না। রিয়াদকে এখন ভাবতে হচ্ছে, প্রতিহামলা চালালে অনিবার্যভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। আর প্রতিহামলা না চালালে এভাবে চুপচাপ শত্রুর হামলা সহ্য করতে হবে।
এ কথা সবাই জানে যে, ইরান ও এর মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে মহাক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা। সেসব হামলার জবাব দিতে ইসরাইলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোয় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোয় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে তেহরান ও তেহরানের সমর্থনপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো।
প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিজ দেশের সমৃদ্ধির জন্য ‘ভিশন ২০৩০’ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাই এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধে জড়ানো কতটুকু বাস্তবসম্মত হবে? আবার সৌদি আরবের অর্থনীতির মেরুদণ্ড তেলশিল্পে ক্রমাগত আঘাত করে যাচ্ছে হুথি বিদ্রোহীরা। তারা লোহিত সাগর দিয়ে রফতানি করা সৌদি তেল ট্যাঙ্কারগুলো আটকে দিচ্ছে।
একদিকে ইরানের হামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশগুলোর তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করতে পারছে না, অন্যদিকে ইরান সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরের বাব আল মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে আটকে দিচ্ছে। এটি সৌদি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অর্থাৎ যে অর্থনীতিকে রক্ষার জন্য সৌদি সরকার ইরান যুদ্ধ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার কথা ভাবছে, সেই ইরান যুদ্ধই সৌদি অর্থনীতিকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। যুদ্ধে না জড়িয়েও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সৌদি আরবের অর্থনীতি। বিশেষজ্ঞদের মতে এ কথাও মনে রাখা দরকার যে, গত ৭ বছর হুথিদের ওপর বোমা ফেলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সৌদি বাহিনী। তাই নতুন করে যুদ্ধে জড়াবে কি না এ নিয়ে উভয় সংকটে সৌদি আরব।
ভাগ্যের লিখন খণ্ডন করা যায় না এমন কথা নিয়তিবাদীরা বলে থাকেন। আর সে পথেই যেন যাচ্ছে রিয়াদ।
বুধবার ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে ‘ইরাকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র যোদ্ধাদের ওপর মার্কিন হামলায় সৌদি আরবের যোগ দেওয়ার’ খবর জানানো হয়। প্রতিবেদনে মার্কিন সেনাদের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়, সৌদি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে মার্কিন বাহিনী ইরাকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র যোদ্ধাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। সেই হামলায় অন্তত ২০ মিলিশিয়ার মৃত্যু হয়েছে। সেই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে বলেও এতে জানানো হয়। এতে আরও বলা হয়, ইরাকের মিলিশিয়ারা সৌদি আরবে ড্রোন হামলার কথা অস্বীকার করেছে।
একই দিনে আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয় ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সৌদি-মার্কিন হামলার প্রতিবাদ করেছে। তারা এই হামলাকে ‘যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়া’ বলে মনে করছে। ইরাক সরকার এই হামলার নিন্দা করেছে। তাদের দেশের মাটি কোনো দেশের হামলার ক্ষেত্র হতে পারে না। অন্যদিকে ইরান সমর্থিত ইরাকের সশস্ত্র সংগঠন ‘ইসলামিক রেসিস্ট্যান্স’ বলেছে, ‘সৌদিদের যেকোনো হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।’ এমন হামলা ও প্রতিহামলার মধ্য দিয়ে সৌদি আরব একটু একটু করে ইরান যুদ্ধের বৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়ছে না তো? এমন প্রশ্ন জাগতে পারে অনেকের মনে।
বৃহস্পতিবার সিএনএন এক বিশ্লেষণে তুলে ধরে ‘যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধ করার পর ইরান কেন যুদ্ধ শুরু করতে চায়?’ এতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দিন ধরে যে ‘শান্তি’ বিরাজ করছিল ইরান তার ইতি টেনেছে। আপাতত শান্ত মধ্যপ্রাচ্যকে ইরান আবারও অশান্ত করে তুলছে। ইরান চায়, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে। বিশ্লেষণটিতে আরও বলা হয়, ইরান স্পষ্টত জানে যে হামলার কারণে তাদের ওপর মার্কিন বোমা নেমে আসবে। তবু যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধ করলেও ইরান তা বন্ধ করতে নারাজ।
এক্স বার্তায় জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের এক গবেষক হামিদ রেজা আজিজি লেখেন, ‘ইরানের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে হামলা শুরু করাকে ইরান সুযোগ হিসেবে গণ্য করছে।’ তার মতে, ইরান নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করছে, যাতে কোনো সম্ভাব্য হুমকি দেখলে দেশটির বাহিনী আগেভাগে হামলা করে বসতে পারে। একই দিনে সিএনএনের অপর এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়, ‘ইরানে আটকে গেছে ট্রাম্প।’
এতে বলা হয়, এই যুদ্ধের কারণে শুধু বিবদমান পক্ষগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। অন্যান্য দেশগুলোর অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খাস যুক্তরাষ্ট্রে খোদ রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ক্রমশ কমছে। এমনকি রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকহারে কমে যাচ্ছে।
গত বুধবার প্রকাশিত সিএনএন/এসএসআরএস জরিপে দেখা গেছে ট্রাম্পের ইরান নীতিকে ৩০ শতাংশের কম মার্কিনি সমর্থন দিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বিজয় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে। বিশ্লেষণটিতে আরও বলা হয়, ট্রাম্প চাচ্ছেন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ইরান সমস্যার সমাধান করতে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের অনেককে পাশে পেতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ভান্ডারে টান পড়ার সংবাদ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন যে ইউরোপের মিত্ররা ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের চোরাবালিতে পড়তে আগ্রহী নয়। তা বুঝতে পেরে ট্রাম্প এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলার শিকার আরব দেশগুলোকে কাছে টানার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে ট্রাম্প অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরবকে খুশি করতে দেশটির সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করেছে। ভবিষ্যতে আরও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে শেষমেশ রিয়াদকে ইরান যুদ্ধে জড়াতে তিনি সক্ষম হন কি না এখন তাই দেখার বিষয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও