গ্যাসের চাপ কম থাকায় সাভার ও আশুলিয়া এলাকার শিল্প-কারখানাগুলো কখনো চলছে, আবার কখনো বন্ধ থাকছে। গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিজস্ব ব্যবস্থা থাকলেও গ্যাসের সংকটে শিল্প-কারখানাগুলো সেগুলোও চালাতে পারছে না। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে শিল্পোদ্যোক্তারা। দেশের অন্যতম বড় অর্থচালিকা শক্তি পোশাক শিল্প কারখানা আজ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ধুঁকে ধুঁকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সাভার ও আশুলিয়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে হাজারের ওপর শিল্প-কারখানা রয়েছে।
এখানকার শিল্প খাত এখন গভীর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদনে। গ্যাসনির্ভর অসংখ্য কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে, অনেক কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান দিনে কয়েক ঘণ্টার বেশি উৎপাদন চালাতে পারছে না। সেই ধারাবাহিকতায় আশুলিয়ায় গোয়ালবাড়ী এলাকায় ডিজাইনার ফ্যাশন লিমিটেড কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সম্প্রতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আশুলিয়ার গোয়ালবাড়ী এলাকায় ডিজাইনার ফ্যাশন কারখানার শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডিজাইনার ফ্যাশন লিমিটেড কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হয় ডিজাইনার ফ্যাশন লিমিটেডের হিউম্যান রিসোর্স ও অ্যাডমিন বিভাগের ম্যানেজার সুমন সরকারে সঙ্গে। আলাপকালে তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে আপাতত কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। জানি না কবে থেকে আবার কারখানা চালাতে পারব। আমাদের এখানে প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। একজনের পরিবারে যদি তিনজন সদস্যও হয় তা হলে প্রায় ২৪-২৫ হাজার শ্রমিকের রুটি-রুজির জায়গা এই কারখানা। আগে লাইনে গ্যাস না থাকলেও সিএনজি গ্যাস দিয়ে কারখানা চালাতাম। এখন তাও বন্ধ করে দিয়েছে। কারখানার পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ, লাইনে গ্যাস না পেলেও অন্তত সিএনজি গ্যাস যেন আমরা পাই।
ডিজাইনার ফ্যাশন লিমিটেডের হিউম্যান রিসোর্স ও অ্যাডমিন বিভাগের ম্যানেজার সুমন সরকার আরও বলেন, কারখানায় প্রতিদিন উৎপাদন এক লাখ পিস। বন্ধ থাকলে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি টাকা। সঠিক সময়ের মধ্যে যদি কারখানায় শিপমেন্ট মাল তৈরি করতে না পারি তা হলে আমাদের শিপমেন্ট বাতিল হয়ে যাবে। লাইনের গ্যাস কিংবা সিএনজি গ্যাস কখন পাব কিংবা আদৌ পাব কি না জানি না। তাই প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের উদ্বিগ্ন থাকতে হয়।
এ বিষয়ে কথা হয় সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের সিনিয়র ম্যানেজার আবু রায়হানের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, গ্যাস সংকটে সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। কারখানাগুলো ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আগে প্রতি ঘণ্টায় যে উৎপাদন হতো এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে সময়মতো পণ্য শিপমেন্ট করা যাচ্ছে না। সাভার ও আশুলিয়ার শত শত শিল্প-কারখানার একই অবস্থা বলেও জানান আল-মুসলিম গ্রুপের সিনিয়র ম্যানেজার আবু রায়হান।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাভারের তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আবু সালেহ খাদেম উদ্দিন বলেন, জাতীয় পর্যায় থেকে গ্যাস সরবরাহ কম হওয়ায় কলকারখানা ও আবাসিক এলাকাগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সাভারের তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আবু সালেহ খাদেম উদ্দিন আরও বলেন, আমরা চেষ্টা করছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে পার্থক্য এর জন্যই সমস্যাটা বেশি হচ্ছে। আমরা যে পরিমাণ গ্যাস পাই তা মোটামুটি সমানভাবে সরবরাহের চেষ্টা করছি।
এদিকে শিল্প মালিকরা বলছেন, সাভার ও আশুলিয়ায় এক হাজারের বেশি ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। দীর্ঘদিন সংকট চললে ছোট ও মাঝারি শিল্প বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে শুধু উৎপাদনই নয়; রফতানি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, এমনকি সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। শিল্প খাত না বাঁচলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থেমে যাবে। তাই শিল্পের গ্যাস-বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো না গেলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমার পাশাপাশি রফতানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয় পাশাপাশি বিদেশি শিল্পের তৈরি পোশাকসহ বস্ত্র খাতের কারখানাগুলো চালু রাখাই এখন উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। সময়মতো ক্রয়াদেশ পৌঁছানো নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন রফতানি খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা।
তারা বলছেন, দীর্ঘদিন থেকেই গ্যাস সংকট চলছে। সরেজমিন কথা হয় ডিজাইনার ফ্যাশন লিমিটেডের অপারেটর মুক্তি খাতুনের সঙ্গে। আলাপকালে তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে ডিজাইনার ফ্যাশন লিমিটেড কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এখন চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছি। জানি না কবে আলোর মুখ দেখব। কী করে সংসার চালাব। কারখানা যদি না খোলা হয় তা হলে বেতন পাব না। ঘর ভাড়া, দোকানের বাকি দিতে পারব না। মহাসংকটের মধ্যে আছি। তাই যত তাড়াতাড়ি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা সরকারের পক্ষ থেকে সমাধান করা হবে তত তাড়াতাড়ি কারখানা চালু হবে এবং আমাদের জন্য মঙ্গল হবে।
আরেক শ্রমিক সন্ধ্যা রানী বলেন, গ্যাস না থাকার কারণে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কবে নাগাদ খুলবে তাও জানি না। যদি দ্রুত কারখানা না খুলে তা হলে পরিবার নিয়ে আর্থিকভাবে সমস্যায় পড়ে যাব। তাই সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, গ্যাস সমস্যার সমাধান করে যথাসময়ে কারখানা খুলে দেওয়া হোক। এটা আমাদের প্রাণের দাবি।
ডিজাইনার ফ্যাশন লিমিটেডের প্রোডাকশন ম্যানেজার দেলোয়ার হোসেন বলেন, গ্যাসের চাপ গত কয়েক দিন ধরে অনেকটাই কম। এতে আমাদের পণ্য উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। যেটি আমাদের পোশাক খাতের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ কারণে ডিজাইনার ফ্যাশন লিমিটেড কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। তাই আমি তিতাস গ্যাসসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।
এর পাশাপাশি অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের কারণে একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাসের বৈধ ব্যবহারকারীরা সময়মতো পাচ্ছে না পর্যাপ্ত গ্যাস।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আরবিএন