একদিকে মসজিদের মাঠ ভরাটের জন্য মাটি কাটার অনুমতি, অন্যদিকে সেই অনুমতির আড়ালে সমুদ্রসৈকত থেকে উত্তোলন হচ্ছে বালু। কাগজে-কলমে অনুমতি মাত্র এক দিনের, অথচ স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৩ মাস ধরে চলছে বালু উত্তোলন। এরপর উত্তোলিত বালু দিনদুপুরে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ ও বিক্রি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য শাহ্ আলম, মাহবুব আলম ও নেজাম উদ্দিনের নেতৃত্বে বাঁশখালী সমুদ্র সৈকতের বাহারছড়া পয়েন্টে বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সরকারি অনুমতির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ভাঙন নিয়েও তৈরি হয়েছে উৎকন্ঠা। এতে নষ্ট হচ্ছে সৈকতের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাহারছড়া পয়েন্টে বেড়িবাঁধের পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বালু। দিনদুপুরে দুটি ট্রাকে করে এসব বালু অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমতিপত্রে মাটি কাটার কথা থাকলেও বাস্তবে বেড়িবাঁধের পাশ থেকে বালু তুলে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি উত্তোলিত বালু মসজিদের কাজে ব্যবহার না করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এজহারুল হক চৌধুরী জামে মসজিদের মাঠ ভরাটের জন্য মাটি কাটার অনুমতি চেয়ে গত ১৮ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেন মসজিদ কমিটির সভাপতি মরতুজ আলী।
আবেদনের প্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আবেদন করা স্থানটি সাগরের কোলঘেঁষা ব্যক্তিমালিকানাধীন চিংড়ি প্রজেক্টের জমি।
এরপর আবেদনের প্রেক্ষিতে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতিপত্রে ৬টি শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়। এরমধ্যে অন্যতম- কর্তন করা মাটি এজহারুল হক চৌধুরী জামে মসজিদের মাঠ ভরাটের কাজে ব্যবহার করতে হবে। কোনোভাবেই আশপাশের জমির ক্ষতি করা যাবে না। পরিবহনের সময় গ্যাসলাইন, বিদ্যুৎলাইন, পয়ঃনিষ্কাশন লাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থাপনা বা লাইনের ক্ষতি করা যাবে না।
এ ছাড়া পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হলে তার সম্পূর্ণ দায় আবেদনকারীর ওপর বর্তাবে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- অনুমতিপত্রে বলা হয়েছে, কর্তন করা মাটি ১৬ সেপ্টেম্বর পরিবহন করা যাবে এবং অনুমতিপত্রটি শুধুমাত্র ১৯ জুনের জন্যই প্রযোজ্য।
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মসজিদ ভরাটের জন্য মাটি কাটার অনুমোদন নেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আর অনুমোদন পাওয়ার প্রায় ৩ মাস পরও এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।’
রত্নপুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাঁশখালী উপকূলে এখনো স্থায়ী বেড়িবাঁধ নেই। এর মধ্যে বেড়িবাঁধের পাশ থেকে বালু কেটে নেওয়া হলে বর্ষা, জোয়ার কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে উপকূলের মানুষের জীবন ও সম্পদের বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক ইউপি সদস্য শাহ্ আলম অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা মসজিদের জন্য মাটি কেটেছি। বালু উত্তোলনের বিষয়টি সঠিক নয়।’
এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘একদিনের জন্য মাছের প্রজেক্ট থেকে মাটি কেটে মসজিদের জন্য ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে, কোনোভাবেই অন্য জায়গা থেকে মাটি কাটা যাবে না। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখতেছি।’
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে কোথাও নদী থেকে, কোথাও পাহাড়ি ছড়া থেকে, আবার কোথাও উপকূলের মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুকুরিয়া ইউনিয়নের তেচ্ছিপাড়া সাঙ্গু নদীর তীর, খানখানাবাদ ইউনিয়নের চৌধুরী হাট সংলগ্ন সাঙ্গু নদী এবং পুঁইছড়ি ইউনিয়নের নাপোড়া গ্রামের ভিলেজারপাড়া ও পূর্ব পুঁইছড়ির পাহাড়ি ছড়া থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র বালু উত্তোলন করে আসছে বলে জানিয়েছেন আশেপাশের বাসিন্দারা।
সময়ের আলো/মহু