কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করেই নিয়োগ বোর্ডের সদস্যের স্বাক্ষর জালিয়াতি ও অর্ধকোটি টাকা লেনদেনের মাধ্যমে মাদরাসায় ৫টি পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার করমদি দারুচ্ছুন্নাহ নেছারিয়া দাখিল মাদরাসার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আব্দুল মান্নান ও মাদরাসার সুপার আবু জাফরের দিকে।
স্থানীয়দের দাবি, একাধিক প্রার্থী বাছাই করে যে প্রার্থী বেশি টাকা দিয়েছে তাকেই নিয়োগ দিয়েছে এই কমিটি। প্রার্থীর কাছ থেকে ন্যূনতম ৮ থেকে ১৪ লাখ টাকা নিয়ে গোপনে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
জানা যায়, মাদরাসাটিতে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আয়া, নিরাপত্তাকর্মী, ল্যাব সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। কাগজপত্রে ১৭ অক্টোবর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও তা কোথায়, কখন ও কীভাবে হয়েছে, সে বিষয়ে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের কেউই কিছুই জানেন না। নিয়োগপ্রাপ্তদের ২১ অক্টোবর যোগদানের কথা থাকলেও জটিলতার কারণে কেউ এখনো প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি। স্থানীয়রা নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে একাধিকবার অনুরোধ করলেও মাদরাসার সুপার আবু জাফর তা দেখাতে রাজি হননি। এমনকি প্রতিষ্ঠানে গিয়েও তার দেখা মেলেনি। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
করমদি পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা সুজন মাহমুদ জানান, এই ৫টি পদে নিয়োগের বিষয়ে জানতে গ্রামের একাধিক মানুষ মাদরাসায় গেলেও সুপার কোনো তথ্য দেননি। বিভিন্ন পদে ৮ থেকে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে নিয়োগ সম্পন্ন করার কথা তারা এলাকায় শুনেছেন। এই নিয়োগ পরীক্ষা ও সমস্যা সমাধানে সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন তিনি।
ল্যাব সহকারী পদের প্রার্থী করমদি মাঠপাড়ার রাসেল মাহমুদ জানান, তিনি নিজে ল্যাব সহকারী পদের জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। কমিটির সভাপতি আব্দুল মান্নান তার কাছে ১২ লাখ টাকা দাবি করেন। সে টাকা দিতে না পারায় অন্য একজনকে টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্রে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য সচিব মোছা. শামসুন্নাহার বলেন, ফলাফল শিটে থাকা স্বাক্ষরটি তার নয়। পরীক্ষা কবে, কোথায় ও কীভাবে হয়েছে সে সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা নেই বলে তিনি জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদরাসার কয়েকজন সহকারী শিক্ষক জানান, প্রতিষ্ঠানে এখন পর্যন্ত বৈধভাবে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি, তবে নিয়োগের নামে স্বাক্ষর জাল করে অর্ধকোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।
আবু জাফর জানান, সকল নিয়ম মেনেই নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। একটি কুচক্রীমহল বৈধ নিয়োগকে অবৈধ বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন। কেন তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন জানতে চাইলে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আব্দুল মান্নান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টি শিক্ষা কর্মকর্তা ও ডিজির প্রতিনিধি অবগত আছেন এবং সাংবাদিকদের এ নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই।’
গাংনী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মনিরুল ইসলাম জানান, নিয়োগ কমিটি যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দিয়েছে, তা সঠিক নিয়মে হয়নি। গোপনে পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই, এমনকি নিয়োগ কমিটির সদস্যদেরও বিষয়টি জানানো হয়নি। পরে শুধু বেতন বিলে স্বাক্ষরের জন্য তার কাছে কাগজপত্র আনা হয়েছিল। নিয়োগ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ডিজির প্রতিনিধির অনুমোদন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এবং মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর ইতোমধ্যে বাতিল করেছে।
সময়ের আলো/মহু