ইতিহাস, ভ্রমণসাহিত্য ও ইসলামি ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ সংরক্ষণে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে সৌদি আরবের কিং আবদুল আজিজ পাবলিক লাইব্রেরি।
প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনির প্রথম মুদ্রিত ও সুপরিচিত ইংরেজি অনুবাদের একটি দুর্লভ কপি সংগ্রহ করেছে। ঐতিহাসিক এই সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে ১৯৭ বছর আগে, ১৮২৯ সালের ২৭ এপ্রিল।
এই বিরল গ্রন্থটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ ও ভাষাবিদ স্যামুয়েল লি। তিনি ইবনে বতুতার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘তুহফাতুন নুজ্জার ফি গারায়িবিল আমসার ওয়া আজায়িবিল আসফার’-এর একটি সংক্ষিপ্ত আরবি পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে অনুবাদটি প্রস্তুত করেন।
মূল গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ নয়, বরং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত একটি সংক্ষিপ্ত পাণ্ডুলিপিকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল।
শুধু অনুবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেননি স্যামুয়েল লি। তিনি গ্রন্থটিতে বিস্তৃত ঐতিহাসিক ও গবেষণাধর্মী ভাষ্য সংযোজন করেন। ইতিহাস, ভূগোল, বিভিন্ন দেশ ও নগর, উদ্ভিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, স্মৃতিস্তম্ভ এবং বিজ্ঞান ও ইতিহাসের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের পরিচয় তুলে ধরতে তিনি অসংখ্য ব্যাখ্যামূলক পাদটীকা যুক্ত করেন। ফলে অনুবাদটি শুধু একটি ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, বরং ইসলামি ইতিহাস ও সভ্যতা গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।
২৯৪ পৃষ্ঠার এই দুর্লভ সংস্করণের ভূমিকায়ও আরবি ভাষায় বিস্তৃত আলোচনা স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি তিনি বহু প্রাচীন আরবি গ্রন্থের উদ্ধৃতি ও তথ্য ব্যবহার করেছেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘খুলাসাতুল আখবার’, ‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’, ‘আল-ইশারাত ফি মারিফাতিজ জিয়ারাত’, ‘তাকউইমুল বুলদান’, ‘ইয়াতিমাতুদ দাহর’, ‘খুলাসাত তাহকিকিল জুনুন ফি শারহিল মুতুন’ এবং ‘মারাসিদুল ইত্তিলা আলা আসমাইল আমাকিন’ প্রভৃতি।
এ ছাড়া বইটিতে বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা বহু আরব ও মুসলিম মনীষীর পরিচয় এবং বিভিন্ন দেশ ও শহর সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য সংযোজিত হয়েছে, যা গবেষকদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ইবনে বতুতার এই ভ্রমণকাহিনি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভ্রমণবৃত্তান্ত হিসেবে স্বীকৃত। এতে প্রায় ৩০ বছরব্যাপী তার বিস্ময়কর বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং সমকালীন সমাজসভ্যতার অনন্য বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে।
মরক্কোর মারিনীয় সুলতান আবু ইনান আল-মারিনি ইবনে বতুতাকে তার দীর্ঘ সফরের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেন। এরপর আন্দালুসীয় পণ্ডিত ইবনে জুজাই আল-কালবি তার মুখে শোনা বিবরণ লিখিত আকারে সংকলন করেন। গ্রন্থটি ৭৫৬ হিজরি (১৩৫৬ খ্রিস্টাব্দ) সালে মরক্কোর ফেজ নগরীতে সম্পন্ন হয়।
ইবনে বতুতার পূর্ণ নাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিম। তিনি আবু আবদুল্লাহ ইবনে বতুতা নামে সবচেয়ে পরিচিত। ৭০৩ হিজরি (১৩০৪ খ্রিস্টাব্দ) সালে জন্ম নেওয়া এই মহান পর্যটক মাত্র ২১ বছর বয়সে বিশ্বভ্রমণ শুরু করেন। তার সফর উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকা, আরব উপদ্বীপ, শাম, নিকটপ্রাচ্য, আন্দালুসিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ, চীন ও পশ্চিম আফ্রিকাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পৌঁছেছিল।
অসাধারণ এই অভিযাত্রার স্বীকৃতিস্বরূপ কেমব্রিজভিত্তিক এক বিদ্বৎসমাজ তাকে ‘মুসলিম ভ্রমণকারীদের রাজপুত্র’ উপাধিতে ভূষিত করে।
ইবনে বতুতার অমর এই ভ্রমণকাহিনি পরবর্তীকালে ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, ইতালীয়, জার্মান, পর্তুগিজ, সুইডিশ, চীনাসহ বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি ও সভ্যতা গবেষণায় আজও এটি অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও বহুল পঠিত গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।
রিয়াদের কিং আবদুল আজিজ পাবলিক লাইব্রেরির এই বিরল সংস্করণ সংগ্রহের উদ্যোগ শুধু একটি ঐতিহাসিক বই সংরক্ষণের ঘটনা নয়; বরং ইসলামি সভ্যতার সমৃদ্ধ জ্ঞান-ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সংরক্ষণ ও পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ