গাজায় ইসরাইলি হামলায় ধ্বংস হওয়া বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামোর প্রভাব এবার সীমান্ত পেরিয়ে ইসরাইলেও পড়ছে। গাজা থেকে সাগরে অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ছড়িয়ে পড়ায় ইসরাইলের উপকূলে ব্যাপক শৈবাল জন্মেছে। এতে দেশটির ছয়টি প্রধান লবণমুক্তকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্লান্টের মধ্যে পাঁচটির ফিল্টার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে পানির সংকটে পড়তে পারে ইসরাইল।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, অস্বাভাবিক মাত্রায় শৈবাল ছড়িয়ে পড়ার পেছনে গাজার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাওয়াও একটি কারণ। এর ফলে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সাগরে গিয়ে পড়ছে। ইসরাইলের সমুদ্র ও উপকূল রক্ষায় কাজ করা বেসরকারি সংস্থা জালুল এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, দূষণ কোনো রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। গাজা উপত্যকা থেকে অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সাগরে পড়ায় ইসরাইলের লবণমুক্তকরণ প্লান্টগুলোতে চলমান সংকট আরও বাড়ছে। এই বর্জ্যে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মতো পুষ্টি উপাদান থাকে। এগুলো ক্ষুদ্র শৈবাল ও সায়ানোব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং শৈবালের বিস্তার আরও বাড়াতে পারে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও গাজায় এখনও তীব্র পানি ও পয়োনিষ্কাশন সংকট চলছে। ইসরাইলি হামলায় গাজার বর্জ্য শোধনাগারগুলো ধ্বংস হওয়ায় উপকূলে পয়োবর্জ্য জমছে। একই সঙ্গে সেখানে ইঁদুরসহ বিভিন্ন প্রাণীর উপদ্রবও বেড়েছে। গাজার ঠিক অপর পাশে ইসরাইলের উপকূলে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ শৈবালের স্তর ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেশটির ছয়টি প্রধান লবণমুক্তকরণ প্লান্টের মধ্যে পাঁচটির ফিল্টার বন্ধ হয়ে যায়।
প্লান্টগুলো কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর আবার চালু হলেও এখনও স্বাভাবিক সক্ষমতার চেয়ে কম মাত্রায় কাজ করছে। বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও লবণমুক্তকরণ বিশেষজ্ঞ জ্যাক গিলরন বলেন, গাজা থেকে অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সাগরে পড়ায় দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে ইসরাইলের পানি উৎপাদন অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ছে। এই ঘটনা ইসরাইলের পানীয় জলের অন্যতম প্রধান উৎসকে সম্ভাব্য হুমকি থেকে রক্ষায় প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইলি হামলায় গাজার পানি ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে বলে মেডসাঁ সঁ ফ্রতিয়েরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কূপ, পানির পাইপলাইন, জলাধার ও লবণমুক্তকরণ ইউনিটেও সরাসরি হামলা হয়েছে। যুদ্ধের আগে গাজার পানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসত উপকূলীয় এলাকার ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে। এখন সাগরের পানি ও পয়োবর্জ্যে তা দূষিত হয়ে মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত তিনটি পানির পাইপলাইনও যুদ্ধের শুরুতে বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেগুলোর কার্যক্রম আংশিকভাবে চালু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত বিতরণব্যবস্থার কারণে গাজার অনেক মানুষ এখন পানির ট্রাকের ওপর নির্ভরশীল।
গাজার পাঁচটি বর্জ্য শোধনাগারের সবগুলোই অচল হয়ে আছে বলে জানিয়েছেন গাজার উপকূলীয় পৌরসভাগুলোর পানি সরবরাহ সংস্থার উপপরিচালক ওমর শাতাত। তার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৪৫ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পড়ছে। আরও প্রায় ১৫ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য প্রতিদিন মাটির গর্তের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশছে।
শাতাত বলেন, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে এটি একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। সাগর মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গাজার বাসিন্দা ও বাস্তুচ্যুত মানুষ, কারণ তারা সবচেয়ে বেশি মাত্রার পয়োবর্জ্যরে সংস্পর্শে রয়েছেন। গাজা শহরে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির মুখপাত্র প্যাট গ্রিফিথস বলেন, শীত শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফিলিস্তিনিরা পয়োবর্জ্যে ঘেরা অবস্থায় বসবাস করছেন। এটি তাদের চারপাশে, যেখানে তারা খায়, পানি সংগ্রহ করে এবং হাঁটে, বলেন তিনি।
গাজার আল-মাওয়াসিতে বাস্তুচ্যুত শাইমা আল-কাতারি বলেন, বাসন ও কাপড় ধোয়ার পানি ফেলার কোনো জায়গা নেই। ফলে তা রাস্তায় ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এতে জমে থাকা পানিতে শৈবাল ও মশা বাড়ছে। দুর্গন্ধ, মশা-মাছি ও ইঁদুরের উপদ্রবও বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক মাস ধরে গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইঁদুরের উপদ্রব চলছে। কাঁচা পয়োবর্জ্য ও আবর্জনার স্তূপের কারণে বাস্তুচ্যুতদের ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে ইঁদুরের সংখ্যা বেড়েছে। গাজার সীমান্তবর্তী ইসরাইলি এলাকাগুলোতেও নজিরবিহীন ইঁদুরের উপদ্রব দেখা দিয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ইকোপিস মিডল ইস্টের ফিলিস্তিন পরিচালক নাদা মাজদালানি বলেন, যুদ্ধের পরিণতি সীমান্তে থেমে থাকে না। গাজায় হেপাটাইটিস এ বাড়ছে। আমি মনে করি, আমরা একটি বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। গাজায় বড় ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব হলে তা শুধু গাজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এদিকে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মানুষকে পানি ‘সতর্কতার সঙ্গে’ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে পানির সরবরাহ কমানো হয়েছে এবং কৃষকদের সেচ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। ইসরাইলের পরিবেশবাদী সংগঠন জালুল ও ইকোপিস গাজায় পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে ইসরাইলি সংস্থা কোগাটের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গাজার বর্জ্য শোধনের সুযোগ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে তারা। জালুল বলেছে, দূষণ চলতে থাকলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো দেশেই পড়তে পারে। সমুদ্রের পরিবেশ দূষিত হলে মানুষ ও প্রকৃতি— উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা সীমান্তের যে পাশেই থাকুক না কেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি