বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বনটিতে দস্যু, চোরা শিকারি এবং বিভিন্ন অপরাধীর তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগ যেন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযানে অপরাধীরা গ্রেফতার হলেও আইনের দুর্বল প্রয়োগ, দ্রুত জামিন লাভ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে অনেকেই আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে, বন বিভাগের জন্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনবলসংকট, আধুনিক জলযানের অভাব এবং প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও সুন্দরবন বন বিভাগের বনরক্ষীরা নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছেন। বন বিভাগের দাবি, ধারাবাহিক এসব অভিযানের কারণে সুন্দরবন এলাকায় বন অপরাধ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের (বাগেরহাটের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ) জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিচালিত অভিযানে গত এক বছরে (২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী) মোট ২৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৩৭৭ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বনরক্ষীরা এ সময়ে বনাঞ্চলের গভীরে জলপথে ও হেঁটে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের এই দুই রেঞ্জ ও সংলগ্ন এলাকা থেকে মোট ২৪৯ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে। কঠোর নজরদারির কারণে পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় এই বছর মাংস জব্দের পরিমাণ ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি পর্যন্ত কমেছে।
নির্দিষ্ট করে শুধু হরিণ শিকারের নাইলনের ফাঁদ ছাড়াও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী সব ধরনের বেআইনি ফাঁদ উচ্ছেদ করা হয়েছে। যার মধ্যে বনের নদী ও খালে অবৈধভাবে কাঁকড়া শিকারের জন্য পাতা ৮ হাজার ৩৮১টি বিশেষ ফাঁদ (স্থানীয় ভাষায় 'চারু') জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে।
বন বিভাগের বিভিন্ন স্টেশন ও টহল ফাঁড়িতে কর্মরত বনকর্মীরা জানান, বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই হরিণ শিকার, বন্যপ্রাণী নিধন ও বিষ দিয়ে মাছ ধরার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত অভিযানে অবৈধ জাল, নৌকা, আটনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হচ্ছে। পাশাপাশি অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে।
বাগেরহাট, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন,‘বিশেষ টহল দল এবং পায়ে হেঁটে টহলের মাধ্যমে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। ফলে, সুন্দরবনের অপরাধের সংখ্যা কমে এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হরিণ শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি জনবলসংকট, আধুনিক জলযানের অভাব এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সীমাবদ্ধতার পরও বনকর্মীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে।’
সময়ের আলো/মহু