বৃদ্ধ বয়সে পঙ্গু বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন সন্তানেরা। খোঁজখবরও রাখেন না কেউ। দুর্বল ও প্রতিবন্ধী শরীর নিয়ে কষ্ট করে বাঁধের রাস্তায় উঠে মানুষের কাছে হাত পেতে যা পান, তাই খেয়ে দিন কাটে আশিউর্ধ্ব আজিজুর রহমানের। সমাজসেবা অধিদফতরের প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও সেই টাকার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সেটিও জানেন না তিনি। সরকারি খাসজমিতে টিনের চালার ছোট্ট একটি ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে তার।
যে বয়সে পরিবারের সঙ্গ, যত্ন ও সহমর্মিতা পাওয়ার কথা, সেই বয়সেই তিনি হয়ে উঠেছেন অবহেলিত ও একাকী। শুধু সন্তানদের কাছেই নয়, প্রতিবেশীদের কাছেও যেন তিনি এখন বোঝা। যে সন্তানদের বুকে আগলে রেখে মানুষ করেছেন, বার্ধক্যে এসে সেই সন্তানরাই তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। অসহায় বৃদ্ধ আজিজুর রহমানের নির্মম জীবনসংগ্রাম দেখার যেন কেউ নেই।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মোগলবাসা ইউনিয়নের কিসামত মালভাঙ্গা মৌজার চড়াইপট্টি এলাকায় এখন তার বসবাস। তার বাবা মৃত শরিয়ত উল্যাহ। একসময় ধরলা নদীর ওপারে ছিল তাদের বসতভিটা। নদীভাঙনে সব হারিয়ে পরিবার নিয়ে ওয়াপদা বাঁধের ঢালে আশ্রয় নেন তিনি। কয়েক বছর আগে নদীতে ডুবে মারা যান তার স্ত্রী। তিন সন্তানের মধ্যে দুই ছেলে বর্তমানে ঢাকায় থাকেন। একমাত্র মেয়ে স্বামীর সঙ্গে বাবার বাড়ির পাশেই বসবাস করেন। কিছুদিন আগেও মেয়ের কাছেই থাকতেন আজিজুর রহমান। তবে মেয়ে-জামাইয়ের আপত্তির কারণে সেখান থেকেও তাকে চলে যেতে হয়। এখন তিনি গৃহহীন, পরিবারহীন। কোনো সন্তান তার খোঁজ নেন না। প্রতিবেশীদের দয়া আর সহানুভূতির ওপরই নির্ভর করে চলছে তার খাবার ও বেঁচে থাকার লড়াই।
বৃদ্ধ আজিজুর রহমান বলেন, আল্লাহ কেন মোক নেয় না! আল্লাহ না নেয়, শুধু ভাল মানুষগুলা মরে। মোক আর নেয় না। এতো কষ্ট ভালো লাগে না। কয়েক বছর আগৎ বউ নদীর পানিত পরি মারা গেইছে। এলা ছেলে-মেয়েও মোক দেখে না, আশপাশের মানুষ মোক যা দেয়, তাই খ্যায়া কোনো রকম বাঁচি আচং।
স্থানীয় লোকমান, হযরত আলী আব্দুল মালেকসহ অনেকেই বলেন, আজিজুর আগে সুস্থ ছিল পরে প্যারালাইসিস হয়। তখন থেকে ছেলেমেয়েরা দেখে না। অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে। ভিক্ষা করে আগে খেতো। এখন তো ভিক্ষা করেও খেতে পারছে না। উনি নিজেই অসুস্থ। স্থানীয় লোকেরাও যার যার সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। কার জন্য কে কাঁদে! তবুও কিছু মানুষ খাবার দেয় সহযোগিতা করে।
প্রতিবেশী সিরাজুল ইসলাম বলেন, একটা মেয়ে এবং দুইটা ছেলে আছে। তারা কেউ খোঁজখবর রাখে না। আগে বিভিন্ন জায়গায় রাত কাটাতো। এখন বাঁধের রাস্তার পাশে ছেলেরা এহনা ছোট টিনের ঘর তুলে দিয়েছে সেখানে থাকে।
আজিজুর রহমানের ছেলে-মেয়ের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।
মোগলবাসা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহফুজুর রহমান মিলন বলেন, মানুষটি হতদরিদ্র এবং বয়স্ক। দীর্ঘদিন মেয়ের বাসায় ছিলেন। এখন তিনি ওয়াপদা বাঁধের খাস জমিতে আছেন। আজিজুর রহমানের মতো দেশের আনাচে কানাচে অনেক বয়স্ক মানুষকে তাদের সন্তানেরা দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের প্রতি কেন এত অবহেলা। তার নামে প্রতিবন্ধী ভাতার অর্থ পরিবারের লোকজন তুলে খায়। আমি চেষ্টা করছি যাতে করে এ সমস্যার সমাধান হয়।
সময়ের আলো/জোই