জুলাইয়ের ৩৬তম দিনে সরকার পতনের পর সংসদ ভবনে সবার আনন্দ উৎসব। ছবি : সময়ের আলো
২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের পক্ষে রায় দেওয়ার পর তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারও ধারণা করতে পারেনি যে মাত্র দুমাসের মধ্যেই তাদের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটবে। জনঅসন্তোষ, আন্দোলন, সংঘর্ষ এবং রক্তপাতের ভেতর দিয়ে টানা ৩৬ দিনের একটা ভয়াবহ যাত্রা শেষে পতন হয় হাসিনা সরকারের, যা ইতিহাসের পাতায় ৩৬ জুলাই নামে জায়গা করে নিয়েছে।
হাইকোর্টের রায়ের প্রতিবাদে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। শুরুতে সরকার বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে ১৬ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ওই দিন তিন জেলায় অন্তত ৬ জন নিহত হন। এর মধ্যে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের ওপর পুলিশের গুলির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
সাধারণ মানুষের গণজোয়ার। ছবি : সময়ের আলো
এরপর সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন, কারফিউ জারি এবং সেনা মোতায়েনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা এবং গুলিতে নারী-শিশুসহ বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে।
৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এরপর ৫ আগস্ট 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচিতে লাখো মানুষ রাজধানীর রাজপথে নেমে এলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান।
হাইকোর্টের রায়ে কী ছিল?
সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা সরকারি পরিপত্রের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কয়েকজন ২০২১ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। সেই রিটের শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৫ জুন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ফলে, ফলে সরকারি চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের মতোই ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকবে বলে তখন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন রিট আবেদনকারী মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। তবে, শুরুতে অন্যান্য কোটার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না। পরে ১৪ জুলাই প্রকাশিত ২৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা বহাল রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে জেলা, নারী, প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কোটাও আগের নিয়ম অনুযায়ী চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ে আরও বলা হয়, ৩ মাসের মধ্যে সরকারকে নতুন পরিপত্র জারি করতে হবে। তবে, প্রয়োজন হলে সরকার কোটার হার কমাতে বা বাড়াতে পারবে। এছাড়া, কোনো কোটায় প্রার্থী না থাকলে সেই পদ সাধারণ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করার কথাও উল্লেখ করা হয়।
শহরের দেয়ালে আন্দোলনের এক গ্রাফিতি। ছবি : সময়ের আলো
কোটা আন্দোলনের পটভূমি
২০১৮ সালের আগে সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা ছিল। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনকারীরা মুক্তিযোদ্ধা কোটাকে ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার দাবি তুললেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ এপ্রিল সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে সব কোটা বাতিল করে।
পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের করা রিটের ভিত্তিতে আদালত কোটা বাতিলের সেই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করলে আবারও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। ৫ জুন হাইকোর্টের রায় ঘোষণার দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন বড় সমাবেশে আন্দোলনকারীরা কোটা বাতিলের পরিপত্র বহাল রাখার দাবি জানান। একই সময়ে জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও আন্দোলন শুরু হয়।
সরকার পতনের পর আনন্দমুখর আন্দোলনকারী। ছবি : সময়ের আলো
৩৬ দিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা
ঈদুল আজহার ছুটির কারণে আন্দোলন কিছুদিন স্থগিত থাকলেও পহেলা জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্দোলন দ্রুত দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনকে সুসংগঠিত করতে শুরুর দিকে দেশব্যাপী ৬৫ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বয়ক রাখা হয় ২৩ জন। বাকিরা ছিলেন সহ-সমন্বয়ক।
নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের পরবর্তী কয়েক দিন ঢাকা, জগন্নাথ, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
৪ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। এর প্রতিবাদে ৭ জুলাই সারা দেশে 'বাংলা ব্লকেড' কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে ১০ জুলাই আপিল বিভাগ চার সপ্তাহের জন্য হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করে এবং ৭ আগস্ট পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে।
১৪ জুলাই হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরাও (চাকরি) পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি পুতিরা পাবে?তার মানে হলো মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতি-পুতিরা কেউ মেধাবী না, যত রাজাকারের বাচ্চারা-নাতি-পুতিরা হলো মেধাবী, তাই না?’
শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যের প্রতিবাদে সেদিন মধ্যরাতে বিক্ষোভ করেন ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভকারীরা মিছিল করার সময় ‘তুমি কে আমি কে?- রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে?- স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ স্লোগান দেন।
এ ঘটনার পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে ব্যাপক মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও তাদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে।
১৬ জুলাই সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন নিহত হন। এর মধ্যে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবু সাঈদ। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করলেও আন্দোলন থামেনি।
১৮ ও ১৯ জুলাই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, সরকারি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং পরে কারফিউ জারির মতো ঘটনা ঘটে। পরবর্তী দিনগুলোতেও সংঘর্ষ, হতাহতের ঘটনা এবং গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত থাকে।
শেষ পর্যন্ত ৩ আগস্ট সরকার পতনের এক দফা দাবির ঘোষণা দেওয়া হয় এবং ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে লাখো মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান। এর মধ্য দিয়ে হাইকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করে।