২০২৪ সালের জুনের কোটা আন্দোলন রক্তক্ষয়ী রূপ নেয় ১৬ জুলাই। এদিন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দু'হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। তার এই বীরোচিত আত্মত্যাগ পুরো দেশকে নাড়া দেয় এবং রংপুরের সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে একাত্ম করে তোলে।
আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ১৮ ও ১৯ জুলাই রংপুরে আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। ১৮ জুলাই মডার্ন মোড়ে সংঘর্ষে অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া এবং ১৯ জুলাই সিটি করপোরেশনের সামনে পুলিশের গুলিতে সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলন, ফল বিক্রেতা মেরাজুল ইসলাম ও সিরামিকসের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ-আল তাহির শহিদ হন। মাত্র চার দিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে মোট ৬ জন প্রাণ হারান।
দমনপীড়ন উপেক্ষা করে ৩ আগস্ট রংপুরের রাজপথে নামে সাধারণ মানুষের ঢল। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী ও অভিভাবকসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এটি গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ ও সর্বাত্মক অসহযোগের ঘোষণার পর আন্দোলনকারীরা পুলিশের সঙ্গে সহনশীল আচরণ ও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করে এক অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি করেন।
সরকার পতনের আগের দিন ৪ আগস্ট রংপুর ছিল চরম উত্তপ্ত। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা অস্ত্র ও পিস্তল নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। দফায় দফায় সংঘর্ষের পর আন্দোলনকারীরা পুরো নগরীর নিয়ন্ত্রণ নেন। এদিনের সংঘাত-সহিংসতায় নগরজুড়ে যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৫ জন কর্মী নিহত হন এবং গুলিতে অসংখ্য সাধারণ মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন। একই দিনে সংঘাতের ছড়িয়ে পড়ে গঙ্গাচড়া, পীরগঞ্জসহ অন্যান্য উপজেলাতেও।
অবশেষে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর পৌঁছালে রংপুরের রাজপথে নেমে আসে লাখো মানুষের বিজয়ানন্দ। শাপলা চত্বর, লালবাগ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে 'শহিদ আবু সাঈদ চত্বরে' জাতীয় পতাকা হাতে সর্বস্তরের মানুষ মিষ্টি বিতরণ ও উল্লাসে মেতে ওঠেন।
ঐতিহাসিক বিজয়ের পর রংপুর সিআইডির তদন্তে বিচার কাজে অগ্রগতি দেখা যায়। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও সিআইডি সূত্র জানায়, তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট প্রস্তুতের কাজ চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে। এমনকি এক পুলিশ সদস্য আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। শহীদ পরিবার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবি— আবু সাঈদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত এই বিজয়ে প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
সময়ের আলো/জেডি