মূলত নাচ ও উপস্থাপনার হাত ধরেই বিনোদন জগতে প্রবেশ তরুণ প্রজন্মের অভিনেত্রী আইশা খানের। ২০২০ সালে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে তার। কাজের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও সাফল্যের সঙ্গে পরিচিতি পেয়েছেন। অভিনয় ও উপস্থাপনা দুই মাধ্যমেই সমানতালে সম্ভাবনার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। নাটক, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের পর এবার সিনেমার মাধ্যমে ক্যারিয়ারে নতুন যাত্রা শুরু করলেন এই অভিনেত্রী। তাকে নিয়ে লিখেছেন মাসুদুর রহমান
সম্প্রতি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে প্রসূন রহমানের নতুন সিনেমা ‘শেকড়’। মাটি ও মানুষের চিরন্তন সম্পর্কের গল্প নিয়ে নির্মিত এই সিনেমায় ‘ফাল্গুনী’ চরিত্রে আইশা খানের অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের নজর কেড়েছে। ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমাটি শুধু তার অভিনয়জীবনের নতুন অধ্যায়ই নয় বরং ভালো গল্পভিত্তিক চলচ্চিত্রের প্রতি তার আস্থারও প্রতিফলন।
আইশা বলেন, ‘শেকড়’ আমার ক্যারিয়ারের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। সিনেমাটি দর্শক গ্রহণ করেছেন। মুক্তির পর থেকে ভালো প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। আসলে মানসম্মত গল্প ও নির্মাণে মুন্সিয়ানা থাকলে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে আসেন।
‘শেকড়’ প্রথমে ঈদে মুক্তির পরিকল্পনা করলেও সে সময় সিনেমা মুক্তির তালিকা বেশ লম্বা হওয়ায় সিদ্ধান্ত বদলান পরিচালক। পরে ফুটবল বিশ্বকাপ শেষে মুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। অবশেষে ৩১ জুলাই প্রেক্ষাগৃহে আসে সিনেমাটি।
ঈদের মৌসুমে নিজের সিনেমা মুক্তি নিয়ে অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে বাড়তি আকাক্সক্ষা কাজ করে। তবে কিছুটা ব্যতিক্রম আইশা খান। উৎসবের বাইরে সাধারণ সময়ে ‘শেকড়’ মুক্তি পাওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তিনি।
অভিনেত্রী বলেন, দর্শক যদি ভালো গল্পের সিনেমা গ্রহণ করেন, তা হলে নির্মাতা ও প্রযোজকরা ভবিষ্যতে আরও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সিনেমা শুধু ঈদ বা বড় উৎসবেই নয়, বছরের যেকোনো সময় দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে, এমন সংস্কৃতি গড়ে উঠুক এমন প্রত্যাশা করছি।
দেশে মুক্তির আগেই ‘শেকড়’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা পেয়েছে। কানাডার টরন্টোয় ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব সাউথ এশিয়ায় (ইফসা) সিনেমাটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়।
এবার ভিনদেশের প্রেক্ষাগৃহে আলো ছড়াচ্ছে ‘শেকড়’। ২ আগস্ট কানাডায় মুক্তি পায় সিনেমাটি। আগামী সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডেও সিনেমাটি মুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশের দর্শকদের জন্য তৈরি হচ্ছে স্প্যানিশ সংস্করণও। তাই প্রথম সিনেমা দিয়েই যেন বিশ্বভ্রমণে বের হচ্ছে আইশার অভিনয়।
আলোচিত এই সিনেমাতে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে অভিনেত্রী বলেন, পরিচালক গল্প শোনানোর পরই চরিত্রটি আমাকে আকৃষ্ট করে। ফাল্গুনীকে নিজের ভেতরে ধারণ করতে পারব, এই বিশ্বাস থেকেই সিনেমাটিতে কাজের সিদ্ধান্ত নিই। তবে এ চরিত্রের জন্য আমার নাম প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন অভিনেতা এফ এস নাঈম। এ জন্য নাঈমের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ। সহশিল্পী হিসেবে তিনি যেমন সহযোগিতাপূর্ণ, তেমনি একজন ভালো মানুষও।
সিনেমায় ফাল্গুনী এমন এক তরুণী, যার জীবনের সঙ্গে মিশে আছে গান, সংস্কৃতি এবং শেকড়ের টান। ছোটবেলার বন্ধু আকাশ বিদেশ থেকে মেয়েকে নিয়ে দেশে ফেরার পর ফাল্গুনী চেষ্টা করে নতুন প্রজন্মকে দেশের সংস্কৃতি ও সংগীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। অভিবাসন, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের গল্পকে মানবিকভাবে তুলে ধরেছে এই চরিত্র, যা আইশার কাছে ছিল অভিনয়ের দিক থেকে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
অভিনেত্রী বলেন, শুটিংয়ের অভিজ্ঞতাও আমার কাছে স্মরণীয়। গাজীপুর, কুষ্টিয়া ও যশোরের বিভিন্ন লোকেশনে কাজ হয়েছে। পরিচালক প্রসূন রহমানের পরিকল্পিত ও শান্ত কর্মপরিবেশ কাজটি আরও সহজ করে দিয়েছে। সেটে কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না, গভীর রাত পর্যন্ত শুটিংও করতে হয়নি। প্রবীণ শিল্পী দিলারা জামান, সংগীতা চৌধুরী, সমু চৌধুরী, এফ এস নাঈমের মতো সহশিল্পীদের সহযোগিতা আমাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
সাধারণত একটি সফল কাজ শিল্পীকে আরও ব্যস্ত করে তোলে। একের পর এক প্রস্তাব আসে নতুন কাজের। তবে ‘শেকড়’ এর পর আপাতত নতুন কোনো কাজে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা নেই আইশার। তার ভাষ্য মতে, প্রস্তাব পেলেও নতুন সিনেমায় যুক্ত হচ্ছি না। এখন ‘শেকড়’ এর পরবর্তী মুহূর্ত উপভোগ করছি। আমি থিয়েট্রিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসিনি। তাই প্রতিদিনই শিখছি। ভুল করছি, আবার সেই ভুল থেকেই নিজেকে গড়ে তুলছি। প্রতিটি চরিত্র আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। এই শেখার পথটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যখন আবার পর্দায় ফিরব, চাই আরও পরিণত একজন অভিনেত্রী হিসেবে ফিরব।
নতুন কোনো সিনেমায় যুক্ত না হলেও আইশার হাতে রয়েছে আরও নতুন একটি কাজ। সোহেল আরমানের পরিচালনায় ‘সংবাদ’ সিনেমায় শুটিং শুরু করেছিলেন প্রায় দুই বছর আগে। বেশ কিছু অংশের শুটিংও হয়েছিল। জানা গেছে, শিগগিরই শুরু হবে সিনেমার বাকি অংশের শুটিং।
একসময় নিয়মিত নাটকে দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে কম কাজ করছেন আইশা। বেছে বেছে নাটক এবং ওটিটির কাজ করছেন তিনি। একই ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের বদলে ভিন্ন গল্প ও শক্তিশালী চরিত্রেই নিজেকে দেখতে চান আইশা। সেই কারণে সাম্প্র্রতিক সময়ে ছোটপর্দায় তার উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
আইশা বলেন, একই ধাঁচের গল্পে কাজ করতে ভালো লাগে না। ওটিটির ক্ষেত্রেও প্রথম দিকে বেশ কিছু প্রস্তাব এলেও পরে মনের মতো গল্প আর পাইনি। এ কারণে দর্শক হয়তো আমাকে কম দেখছেন। আমি সবসময় ভালো গল্প আর চরিত্রের অপেক্ষায় থাকি। পরিমিত কাজেই পরিতৃপ্ত অনুভব করি। রিলাক্সে অভিনয়ে সময় দিই। অনেকে কাজ পাগল। ব্যস্ততায় স্বস্তি খোঁজেন। কিন্তু আমি একটু ব্যতিক্রম। আসলে প্রত্যেকের নিজস্ব হিসাব-নিকাশ আলাদা। অভিনয়ের পাশাপাশি উপস্থাপনায়ও সমান ব্যস্ত আইশা খান। এনটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘রাতের আড্ডা’র নিয়মিত উপস্থাপক হিসেবে প্রতি শুক্রবার দর্শকদের সামনে হাজির হচ্ছেন তিনি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে