শেখ হাসিনা কি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তির কাঁটা?

সময়ের আলো ডেস্ক

রাজনীতি

গাজিয়াবাদের নিরিবিলি হিন্ডন বিমানঘাঁটি। সামরিক বিমানের এই রানওয়েতে ঠিক দুই বছর আগের এক আগস্টের বিকেলে নেমেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ

2026-08-07T10:32:29+00:00
2026-08-07T10:32:29+00:00
 
  শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬,
২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬
রাজনীতি
শেখ হাসিনা কি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তির কাঁটা?
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩২ এএম 
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংগৃহীত ছবি
গাজিয়াবাদের নিরিবিলি হিন্ডন বিমানঘাঁটি। সামরিক বিমানের এই রানওয়েতে ঠিক দুই বছর আগের এক আগস্টের বিকেলে নেমেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে স্বাগত জানাতে টারম্যাকে উপস্থিত হয়েছিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। সেদিন নীতিনির্ধারকদের কল্পনায়ও ছিল না যে এই আশ্রয় দীর্ঘস্থায়ী এক কূটনৈতিক জট তৈরি করবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই আশ্রয়ই এখন নয়াদিল্লির জন্য এক অস্বস্তিকর বোঝায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার পরদিন দিল্লির পার্লামেন্ট ভবন অ্যানেক্সে ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর ব্যাখ্যা করেছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে ও কেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে ভারত এই আশ্রয় দিয়েছে।

সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত ভারত সরকারের ঘোষিত অবস্থান হলো— শেখ হাসিনার ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই’ তাকে ‘তখনকার মতো’ ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। যদিও সেই ‘সাময়িক’ অবস্থান যে দুবছর বা তারও বেশি সময় ধরে গড়াবে, তা শুরুতে কেউ ধারণাও করতে পারেননি।

সাংবাদিক সম্মেলন ও বাংলাদেশের তীব্র প্রতিক্রিয়া

গত দু'বছরে ভারত একাধিকবার প্রকাশ্যে দাবি করেছে, ভারতের মাটিতে অবস্থানকালীন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা আওয়ামী লীগ নিয়ে যে সব মন্তব্য করছেন কিংবা কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন, তা সম্পূর্ণ তার ‘ব্যক্তিগত ক্যাপাসিটি’তে— এর সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। 

কিন্তু গত ৫ই আগস্টের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (এফসিসি) যেভাবে শেখ হাসিনা অনলাইনে ‘লাইভ’ সাংবাদিক সম্মেলনে যুক্ত হন, তা এই বিতর্ককে সম্পূর্ণ এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। ভারত কীভাবে তাকে এই কাজ করতে দিল, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সেদিন রাতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কড়া বিবৃতি জারি করে। 

বাংলাদেশ সরকার ধরেই নিচ্ছে যে, ভারত সরকারই তাকে এভাবে ইন্টার‍্যাক্ট করার অনুমতি দিয়েছে এবং এফসিসি-র ইভেন্টে শেখ হাসিনা যা-ই বলেছেন, তা ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছাড়া বলা সম্ভব নয়। ফলে, শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের পর্যায়ক্রমিক ধৈর্যচ্যুতি বা অস্বস্তি বেড়ে চলাটা অস্বীকার করার উপায় নেই। 

বাংলাদেশ সরকারের দফায় দফায় দাবি বা অনুরোধ সত্ত্বেও কেন শেখ হাসিনার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে না? এই প্রশ্নের জবাবে দিল্লির শীর্ষ কর্মকর্তারা একান্ত আলোচনায় সব সময়ই যুক্তি দিয়ে বলেছেন, শেখ হাসিনা একজন রাষ্ট্রীয় অতিথি, কোনো রাজনৈতিক বন্দি নন; কাজেই তার ক্ষেত্রে এমন কড়া বিধিনিষেধ প্রয়োগ করা চলে না। 

তবে গত কয়েক মাসে এই জটিল কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটি তাগিদ আরও জোরালোভাবে চোখে পড়ছে।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তির কাঁটা 

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে শেখ হাসিনা বর্তমানে অস্বস্তির মূল উপাদান হওয়ার পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ :

মৃত্যুদণ্ড ও প্রত্যর্পণ দাবি : জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের 'হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ'সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামি, যাকে বর্তমান সরকার দেশে ফিরিয়ে আনতে চাইছে।

নোট ভার্বাল : বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চেয়ে ভারত সরকারের কাছে গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই 'নোট ভার্বাল' পাঠিয়েছিল ঢাকা। এরপর বহুবার তাগাদা দেওয়া হলেও ভারত তাতে সাড়া না দিয়ে নীরব রয়েছে।

থমকে থাকা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা : গঙ্গা চুক্তি থেকে শুরু করে বাণিজ্য বিধিনিষেধসহ দুই দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা গত দু'বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে। বাংলাদেশ বলছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিলে আস্থার পরিবেশ ফিরবে না। আর ভারত পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে, তাঁকে বাদ রেখেই আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

ডিব্রিফিং থেকে ডোভালের সরে যাওয়া

ভারতে আশ্রিত বিদেশি অতিথিদের নিয়মিত ‘ডিব্রিফিং সেসন’ করার দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে। শুরুতে বেশ কয়েক মাস এই ভূমিকা পালন করেছিলেন অজিত ডোভাল। ঢাকার বিভিন্ন সফরে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একটি ভালো ব্যক্তিগত সমীকরণও তৈরি হয়েছিল। 

তবে নানা ব্যস্ততার কারণে ডোভাল এখন আর আগের মতো সময় দিতে পারছেন না। দায়িত্ব হাতবদল হয়ে প্রথমে ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর প্রধান তপন ডেকা এবং পরবর্তীতে বর্তমান প্রধান মহেশ দীক্ষিতের কাঁধে বর্তায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি দিল্লির চোখে শেখ হাসিনার গুরুত্ব আগের মতো আর না থাকারই একটি স্পষ্ট প্রমাণ।

শেখ হাসিনার ‘একগুঁয়েমি’ ও দিল্লির বিরক্তি 

দিল্লিতে আসার পর থেকেই শেখ হাসিনার মূল প্রত্যাশা ছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে ভারত তাকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করবে। ঐতিহাসিক কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দিল্লির ঐতিহ্যগত সম্পর্ক থাকলেও, গত দু'বছরে দিল্লি যা-ই প্রস্তাব দিয়েছে, শেখ হাসিনা তা মেনে নেননি। 

বিশেষ করে, নির্বাচনের আগে দলের কৌশল কিংবা সামান্যতম বা সাময়িক হলেও অন্য কারও হাতে নেতৃত্ব হস্তান্তরের প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। তার এই অনড় মনোভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা ভারতীয় কর্মকর্তাদেরও বিরক্ত করেছে বলে জানা গেছে।


বিপাদাপন্ন বা জীবনসংকটে থাকা বন্ধুকে আশ্রয় দেওয়া ভারতের দীর্ঘদিনের নীতি। দালাই লামা বা আফগান প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ নাজিবুল্লাহর পরিবার হোস্ট কান্ট্রি ভারতের প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিলেও, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টি সেভাবে কাজ করেনি। দালাই লামা যেভাবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি সফল ‘হাতিয়ার’ হয়ে উঠতে পেরেছেন, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে তার উল্টোটাই ঘটেছে। 

অর্থাৎ, কূটনৈতিক ‘অ্যাসেট’ বা সম্পদ হিসেবে নয়, বরং তিনি এখন দিল্লির জন্য একটি ‘লায়াবিলিটি’ বা বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আঞ্চলিক ভূরাজনীতির এই নির্মম বাস্তবতাই শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারত সরকারের অস্বস্তি দিন দিন আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

সূত্র : বিবিসি 


  বিষয়:   শেখ হাসিনা  ঢাকা  দিল্লি  সম্পর্ক  অস্বস্তি 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: