প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার (৫ আগস্ট) উদ্বোধন করেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। উদ্বোধনের পরে আজ প্রথম ছুটির দিন হওয়ায় দর্শনার্থীদের সরব উপস্থিতি ছিলো। কিন্তু পরিবার-পরিজন নিয়ে জাদুঘর দেখতে এসে প্রথমদিনের মতো আবারও ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। জাদুঘর খোলার সময়সূচি নিয়ে বিভ্রান্তি, অনলাইনে টিকিট কাটা, রিফান্ডের সুযোগ না থাকা এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। একই সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জাদুঘরে ঢুকতে না পেরে এক পর্যায়ে স্লোগানও দেন দর্শনার্থীরা।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই জাদুঘরের সামনে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ লাইন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তাদের উপস্থিতি। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। বৃহস্পতিবারের মতো সকাল ১১টায় জাদুঘর খোলার প্রত্যাশায় এলেও পরে জানতে পারেন, প্রবেশ শুরু হবে বিকেল ৩টা থেকে। এরপর শুরু হয় তাদের অপেক্ষার পালা। জাদুঘরের মূল ফটকের সামনে ও আশেপাসে বসে থাকতে দেখা যায় তাদের। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তপ্ত রোদে ক্ষোভ বাড়তে থাকে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের। একইসঙ্গে অনেকে ক্ষোভ জানিয়ে চিৎকারও করতে থাকেন। আবার অনেকেই অনলাইনে ভুল তারিখের টিকিট কিনেছেন। তারা রিফান্ড করার ব্যবস্থা রাখার দাবি জানান।
গতকাল রাতে কুমিল্লা থেকে জুলাই জাদুঘর দেখার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসেছেন মিশুক চালক মো: ইসমাল হোসেন। ঢাকায় এসে গতকাল রাতে মিরপুরের শাহ-আলী মাজারে ছিলেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমি কাল রাতে এসেছি শেখ হাসিনার বাড়ি (সাবেক গণভবন) দেখার জন্য। কি ভাঙ্গছে আর কি করছে এখন সেটা দেখার জন্য এসেছিলাম। আমি সকাল সাড়ে নয়টায় এখানে (জাদুঘরের সামনে) এসেছি। পরে দেখি বন্ধ। অন্যান্য লোকজন বললো ১১টার দিকে খুলবে কিন্তু পরে দেখি খুলে না। তারপর জানলাম যে তিনটার সময় খুলবে। এখন আর কি করার। সকাল থেকে এই এলাকা হেঁটে হেঁটে ঘুরলাম। এটা (জাদুঘর) খুললে পরে ঘুরে আবার কুমিল্লা চলে যাবো।
সাভার থেকে পরিবার নিয়ে জাদুঘরে ঘুরতে এসেছেন মো: আল-আমিন। কিন্তু আসার পর পরেন ভোগান্তিতে। তিনি বলেন, আমি পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছি। জাদুঘর সবার জন্য উন্মুক্ত করার পরে, আজ যেহেতু ছুটির দিন তাই আজ সবাইকে নিয়ে এলাম। জুলাইয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিলো সেগুলো বাচ্চাদের দেখানোর জন্যই এখানে আসা।
এসময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আমরা এসেছি সাড়ে ১২টার দিকে। কারণ জানতাম যে সকাল ১১টা থেকে খোলা হবে এটি। কিন্তু এসে দেখি বিকেল তিনটা থেকে খুলবে। এটা যদি তারা আমাদের আগে জানিয়ে দিতো, তাহলে আমরা সেই সময়েই আসতাম। শুধু শুধু রোদের মধ্যে কষ্ট করার দরকার হতো না।
এছাড়া নারায়নগঞ্জ থেকে পরিবার নিয়ে এসেছেন তারেক হাসান সোহেল। তিনি এসেছেন দুপুর ১টার দিকে। তিনিও জাদুঘর খোলার সময় নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন। একই সঙ্গে অনলাইনে টিকিট কাটা নিয়েও ঝামেলায় পড়েন তিনি।
তারেক বলেন, আমার স্ত্রীকে নিয়ে নারায়নগঞ্জ থেকে এসেছি দুপুর ১টার দিকে। আমি জানতাম না যে ৩টা থেকে খুলবে, এটা জানলে ধীরে-সুস্থে আসতাম।
এ সময় অনলাইনে টিকিট কেটে ঝামেলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমি এখানে এসে অনেক লোক দেখে ভাবলাম অনলাইনে টিকিট কেটে ফেলি। এটা করে এক ঝামেলায় পড়েছি। টিকিট কাটার পর দেখি আমাকে ৯ আগস্টের টিকিট দিয়েছে। এখন আমার তো আবার ৯ তারিখে আসার সুযোগ নেই। এখন খুঁজছি যে এই টাকা কি রিফান্ড করা যায় কিনা।
উত্তরা থেকে আসা ব্যবসায়ী আরমান মৃধা জানান, তিনি অনলাইনে দুপুর ২টা থেকে ৪টার স্লটের টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু জাদুঘরে এসে জানতে পারেন, প্রবেশ শুরু হবে বিকেল ৩টা থেকে। তার অভিযোগ, সময়সূচি পরিবর্তন হলেও সেটি অনলাইনে হালনাগাদ করা হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময় ধরে এসে গেটের সামনে এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, গতকাল রাতেই টিকিট কেটেছিলাম। ২টা থেকে ৪টার স্লটের টিকিট নিয়েছিলাম। এখানে এসে দেখি ৩টা থেকে ঢোকানো হবে। অনলাইনে যদি আগে থেকে সময় পরিবর্তনের তথ্য দেওয়া থাকত, তাহলে এই ভোগান্তি হতো না।
এ সময় জাদুঘরে কি দেখতে এসেছেন জানতে চাইলে আরমান বলেন, এখানে আসার কারণ হলো, আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে এটি হয়তো বেশিদিন থাকবে না। তাই ভাবলাম পরিবারকে নিয়ে এসে দেখিয়ে যাই, যাতে পরে বলতে পারি— এক সময় এটা দেখেছিলাম, এখন আর নেই। আপা (শেখ হাসিনা) ফেরত আসবে। টুডে অর টুমরো আসবেই। আপাকেই দরকার; এখন যা অবস্থা...। আমার মূল লক্ষ্য ছিল আমার মেয়েকে নিয়ে আসা, তাকে দেখানো। পাশাপাশি আমার স্ত্রীকেও নিয়ে এসে দেখাতে চেয়েছি। এই আর কী।
কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম এসেছেন জুলাই জাদুঘরে বেড়াতে। অনলাইনে টিকিট কেটে ভোগান্তিতে পড়েন তিনিও।
সিরাজুল ইসলাম জানান, তিনি অনলাইনে তিনটি টিকিট কেটেছেন। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন, সেগুলো আজকের নয়। তার ভাষ্য, টিকিট কাটার সময় তারিখ পরিবর্তনের অপশন থাকলেও সেটি এতটা দৃশ্যমান ছিল না যে তিনি খেয়াল করতে পেরেছেন। ফলে তিনটি টিকিট কেনার পর ভুলটি বুঝতে পারেন। তারিখ নির্বাচনের অপশন আরও স্পষ্টভাবে দেখানো উচিত, যাতে অন্য দর্শনার্থীদেরও আমার মতো একই ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে না হয়।
তিনি আরও বলেন, অনলাইনে টিকিট বুকিং হলেও যারা শেষ পর্যন্ত আসেন না, তাদের জন্য নির্ধারিত স্লট খালি থেকে যায়। এতে দর্শনার্থীর সংখ্যা যেমন কমে, তেমনি অন্যরাও সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
তার মতে, টিকিট বাতিল বা রিফান্ডের ব্যবস্থা থাকলে বাতিল হওয়া স্লটগুলো নতুন করে অন্যদের জন্য উন্মুক্ত করা যেত। মানুষের পরিকল্পনা বদলাতেই পারে। অনেক সময় প্লেনের টিকিটও মিস হয়। যেহেতু অগ্রিম টিকিট কেনার ব্যবস্থা আছে, সেহেতু রিফান্ডের অপশনও থাকা উচিত ছিল। এতে দর্শনার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না।
এদিকে, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অনেক দর্শনার্থী। একপর্যায়ে তারা স্লোগান দেন, হই হই রই রই... টিকিটম্যান গেল কই।
জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মী বলেন, গতকাল (৬ আগস্ট ) রাতেই নোটিশ টানিয়ে জানানো হয়েছিল, শুক্রবার দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘর বিকেল ৩টা থেকে খোলা হবে। তবে অনেকেই আগের সময়সূচি ধরে সকালেই চলে এসেছেন।
উদ্বোধনের পর গতকাল দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয় জাদুঘর। প্রথম দিনেই রাজধানীর জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে প্রবেশকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। অনলাইনে টিকিট না পাওয়া, অফলাইনে টিকিট বিক্রির স্পষ্ট ব্যবস্থা না থাকা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষার পরও জাদুঘরে প্রবেশ করতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দর্শনার্থীরা।
তারা অভিযোগ করেছেন, কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অপেক্ষার কারণ বা প্রবেশের বিষয়ে কোনও স্পষ্ট তথ্যও দেওয়া হয়নি।
পরে এই বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের ভবনের ধারণক্ষমতা সীমিত। তাই পরিকল্পনা ছিল স্লট পদ্ধতিতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করানো। কিন্তু প্রথম সপ্তাহে মানুষের আগ্রহ বেশি থাকায় অনেকেই স্লট পদ্ধতি মানতে চাননি। আমরা এখন একটি পরীক্ষামূলক সময় পার করছি। তাই কিছুটা বেশি মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। তবে পরে শৃঙ্খলিতভাবে প্রবেশ করাতেই হবে। ব্যাগ জমা দিয়ে প্রবেশ, লাইনে দাঁড়ানো— এসব প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগেই। আমার মনে হয়, মানুষও অভ্যস্ত হয়ে যাবে, আমরাও অভ্যস্ত হয়ে যাবো। এক সপ্তাহ চলতে দিন। এত বড় একটি জাদুঘর পরিচালনার অভিজ্ঞতা বাড়লে পুরো প্রক্রিয়া আরও স্মুথ হয়ে যাবে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ