নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভায় দুই মাস ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য চরম দুর্ভোগে রয়েছে লাখো মানুষ। গোসল ও রান্না করাসহ নানা প্রয়োজনে পানি ব্যবহার করতে পারছে না স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মরত শ্রমিকরাও। বিশুদ্ধ পানি না পেয়ে ক্রয় করে পানি খেতে হচ্ছে তাদের। যাত্রামুড়া পাম্প হাউসসহ পানি উত্তোলন পাম্প হাউস গুলো বন্ধ থাকায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তবে, তারাবো পৌরসভা কর্তৃপক্ষের দাবি, গ্যাস সংকট থাকায় বিদ্যুতের অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আর দ্রুত এই পানির সমস্যা সমাধান হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন তারা।
জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভাটি একটি শিল্প নগরী এলাকা। এখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে আগত লাখো শ্রমিক কলকারখানায় চাকুরীর পাশাপাশি বিভিন্ন বাসাবাড়ীতে ভাড়া বসবাস করছেন। আর এসব লাখো মানুষের চিন্তা করে তারাবো পৌর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন এলাকায় ১০টি পানির পাম্প বসিয়েছেন। আর এই পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে সার্ভিস লাইনের মাধ্যমে যাত্রামুড়া, মোগরাকুল, মৈকুলি, দিঘীবরাবো, মাসাবো, খাদুনসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসা বাড়িতে পানি সরবরাহ করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের অজুহাত দেখিয়ে গত দুই মাস ধরে সাপ্লাই পানি সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন তারাবো পৌর কর্তৃপক্ষ। অথচ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ থাকছে। আর এ সময় পানির পাম্প চালু থাকলে পানির সংকট হওয়া প্রশ্নই উঠে না। এ সংকটের কারণে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে অনেককে দূর-দূরান্তে যেতে হচ্ছে, কেউ কেউ আবার চড়া দামে পানি কিনে জীবন বাঁচাচ্ছেন। সবচেয়ে কষ্টে আছেন শ্রমজীবী মানুষ। দিনে এনে দিনে খাওয়া এসব পরিবারের পক্ষে প্রতিদিন পানি কিনে খাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অথচ পানি না পেলেও প্রতি মাসে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বিল আদায় করছে নিয়মিত। পানি না পেয়ে অনেকেই পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পুকুরে পানিতে গোসল করতে গিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। দৈনন্দিন কাজকর্ম ও গোসল তো দূরের কথা, খাওয়ার পানিটুকু না পেয়ে হাহাকার করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তারাব পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আতাউর রহমানের কাছে গেলেও তিনি কোনও সমাধান দেননা। বরং ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দুর্ব্যবহারও করা হচ্ছে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে। প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও তারা কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত শ্রমিক অধ্যুষিত এই অঞ্চলগুলোতে দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি। পানির বিকল্প কোনও ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেককে চড়া দামে খাবার পানি কিনে খেতে হচ্ছে। তবে দীর্ঘ সাত দিন ধরে পানি না থাকায় খেটে খাওয়া সাধারণ শ্রমিকদের পক্ষে প্রতিদিন পানি কিনে খাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পৌরসভা কর্তৃপক্ষের দাবি, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে পাম্প চালানো যাচ্ছে না এবং পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। তবে, কর্তৃপক্ষের এই অজুহাত মানতে নারাজ ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তাদের মতে, লোডশেডিংয়ের সমস্যা থাকলেও পানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। সঠিক পরিকল্পনা ও রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তত নির্দিষ্ট কিছু সময়ে পানি সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব ছিল। তা না করে হঠাৎ করে পুরো সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়।
পানির দাবিতে ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা পৌরসভার দ্বারে দ্বারে ধরণা দিয়েও কোনও সুরাহা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয় নাবিল টেক্সটাইলে কর্মরত এক শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের দিনে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। তার ওপর প্রতিদিন পানি কিনে খাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব না। সাত দিন ধরে গোসল নাই, খাওয়ার পানি নাই। পৌরসভায় গিয়েও কোনও লাভ হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে এখন মানবিক বিপর্যয় দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অবিলম্বে রেশনিং পদ্ধতিতে হলেও দ্রুত পানি সরবরাহ চালু করার এবং সংকট নিরসনে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
যাত্রামোড়া এলাকার বাসিন্দা সাজিদুর বলেন, দুই মাস ধরে পানি নাই, বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। বিল ঠিকই নেয়, কিন্তু পানি দেয় না। পৌরসভায় গেলে শুধু ঘুরায়, কোনও সমাধান দেয় না। ভুক্তভোগীদের একটাই আবেদন সরকার যেন বিষয়টি দেখে।
তবে, দীর্ঘমেয়াদি পানি সংকটের ব্যাখ্যা মানতে নারাজ এলাকাবাসী। দ্রুত পানি সংকট দূর করার দাবি ভুক্তভোগীদের।
এ বিষয়ে তারাবো পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আতাউর রহমান বলেন, দুর্ব্যবহারের বিষয়টি সঠিক নয়। অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে পাম্প চালানো যাচ্ছে না। আর এই সমস্যার কারণেই পানি উত্তোলন এবং সরবরাহ অনেকটা বন্ধ রয়েছে ।
নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর ডিজিএম নাজমুল হাসান বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটের কারণে সারাদেশেই লোডশেডিং বেড়েছে। তবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টা তারাবো পৌরসভায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছি।
এ ব্যাপারে তারাবো পৌরসভার প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, বিদ্যুতের স্বল্পতার কারণে সব পাম্প একসঙ্গে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করছি পানি উত্তোলন করে তা সাপ্লাই নিয়মিত রাখার জন্য। পাশাপাশি পৌরসভার কোনও কর্মকর্তা গ্রাহকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
সময়ের আলো/আতা