ময়লা-আবর্জনা আর দুর্গন্ধের কারণে যে ধোলাইখালের পাড় দিয়ে নাক চেপে হাঁটতে হতো পুরোনো ঢাকার বাসিন্দাদের, সেই চিরচেনা ধোলাইখাল এখন আমূল বদলে গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিশেষ নগর পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের আওতায় আধুনিক হাতিরঝিলের আদলে সাজানো হয়েছে ঐতিহাসিক এই জলাধারটিকে। ঘিঞ্জি ও জনাকীর্ণ পুরোনো ঢাকার বুকে এটি এখন নাগরিক বিনোদন ও স্বস্তির এক নতুন ঠিকানা। সূত্রাপুর ও ধোলাইখাল সংলগ্ন ৫.৩০৯ একর জায়গাজুড়ে এই দৃষ্টিনন্দন পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে মূল জলাধারের বর্জ্য অপসারণ করে ফিরিয়ে আনা হয়েছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ।
পুরোনো ঢাকার ধোলাইখালের এই জলাশয়টিকে নবরূপে পেয়ে উৎফুল্ল স্থানীয় বাসিন্দাদের। ঐতিহাসিক ধোলাইখালের অবশিষ্টাং নিয়ে টিকে থাকা এই জলাশয় হলো ধোলাইখাল পুকুর। জলাশয়টির নতুন এই রূপে চারপাশে বইছে আনন্দের হাওয়া। কেউ নৌকায় চরে ঘোরেন কেউবা মাতেন বন্ধুদের সঙ্গে সাঁতার কাটার আনন্দে।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, আগে এটি ছিল মশার ঝিল, এখন মনে করেন ‘মিনি হাতিরঝিল’। এই ঝিলপাড়া আমাদের কাছে খুবই সুন্দর লাগছে। এখন আর এখানে মশার উৎপাত নেই। এটি ময়লার ডোবা ছিল, এখানে ময়লা পানি ছিল, কচুরি ও মশার কামড়ে মানুষ থাকতে পারত না। কিন্তু এখন সরকারের উদ্যোগে পরিষ্কার করা হয়েছে এবং পার্কের মতো একটি প্রজেক্ট বানিয়ে এটিকে ঝিলের মতো করেছে। এখানে আগে যে পানি ছিল সেটি সব সেচে ফেলে দেওয়া হয়।
পরে বৃষ্টির কারণে পানি জমেছে। নতুন এই পানিতে অনেক মাছ দেখা দেওয়ায় এটি দেখতে আসা অনেকেই মাছ ধরে। ময়লা-আবর্জনা আর দুর্গন্ধের পরিবেশ থেকে মুক্ত করে জলাশয়টিকে যে পরিবর্তন এনে দেওয়া হয়েছে তার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। এ জায়গার কাছেই আসা যেত না দুর্গন্ধের কারণে- খুবই বাজে অবস্থা ছিল। এখন আমাদের হাঁটার এবং বসার একটা জায়গা হয়েছে। আমাদের হাঁটার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। আমাদের সুন্দর একটা পরিবেশ হয়েছে। আমাদের এখন আর বাইরে যেতে হবে না।
আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, ধোলাইখাল পুকুরটি ৫ একরেরও বেশি জায়গা নিয়ে নতুন করে সাজানো হয়েছে। পার বাঁধানো হয়েছে। ওয়াকওয়েতে প্রতিদিন সকালে হাঁটতে আসেন বিভিন্ন বয়সের মানুষ। গিঞ্জি এই ঢাকায় একটু বাতাস আর এক চিলতে সবুজের ছোঁয়া পেতে মা-বাবারা শিশুদের নিয়ে ঘুরতে আসেন এখানে। স্থানীয়দের কাছে এই জলাধার যেন এখন এক নতুন আশীর্বাদ। আমি চাই যে নতুন ঢাকার ছেলেমেয়েরাও এখানে আসুক, আমাদের এখানে এত সুন্দর একটা জায়গা হয়েছে সবাই এটি দেখুক। এখানে ঝরনা করারও কথা রয়েছে বলে জানান তিনি।
‘মিনি হাতিরঝিল’ দেখতে আসা সবুজ মিয়া বলেন, এটি ভালো লাগার প্রধান কারণ হলো এখানে বাসা হওয়ায় ঠিকমতো আগে ঘুমাতে পারতাম না। আমার বাপ-দাদার জন্মস্থান এখানে। এখানে আগে মশায় কামড়াত, ময়লা পানির কারণে নিশ্বাস নেওয়াই কষ্টকর ছিল। এখন মন খুলে নিশ্বাস নিতে পারি। আমি এখানে আগে সচরাচর ঘুরতাম না। এটি সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে এর পরে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর এখানে আর কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। এখানে এখনও লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়নি। আমি চাইব প্রতিটি গেটে একজন করে দারোয়ান রাখা হোক। আর লাইটিংটা ইমারজেন্সি দেওয়ার জন্য- কারণ মাগরিবের আজান দিলে আমাদের এখান থেকে সবাইকে চলে যেতে হয়।
সমস্যার মধ্যে যদি বলি এখানে যে পানি দেখতে পাচ্ছেন সেই পানি বাইরে যাবে না- আর বাইরে থেকেও এখানে পানি আসবে না। এই জায়গা যে কালভার্ট করেছে সেখান দিয়ে অনেক ছিদ্রের মধ্যে দায়িত্বরত ইঞ্জিনিয়ারিং যিনি আছেন তাকে দেখিয়েছি কিন্তু তিনি কোনো কেয়ার করছেন না।
কদিন আগেই এই জলাশয় ছিল ময়লার ভাগাড়। পাশ দিয়ে চলার সময় নাকে রুমাল দেওয়া ছাড়া উপায় থাকত না। মশার উৎপাতেও অতিষ্ঠ ছিল স্থানীয়রা। তবে ২০২১ সালে এটিকে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। খালের ময়লা অপসারণ করার পাশাপাশি নির্মাণ করা হয় ওয়াকওয়ে, শৌচাগার। নির্মাণাধীন রয়েছে অ্যাম্ফিথিয়েটার। কবে শেষ হবে কাজ- প্রশ্ন স্থানীয়দের। শিগগিরই শেষ হবে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি।
ডিএসসিসি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ধোলাইখাল দৃষ্টিনন্দন করার জন্য পাবলিক অ্যামিউজমেন্ট তৈরি করার জন্য পার্কটি করা। ৩১ মে’র মধ্যে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল, আমাদের কিছু কাজ শেষ না হওয়ায় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ওয়াকওয়ের সঙ্গে আমাদের একটা ব্রিজ করার কথা ছিল। কিন্তু আপাতত সেটি আমরা করতে পারছি না। কারণ অর্থায়ন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাকি যে কাজগুলো আছে সেটি সিটি করপোরেশন থেকে আমরা করে দেব। আমার মনে হয় সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যেই হবে।
ঘুরতে আসা সিলভী রহমান বলেন, এটি এখন খুবই ভালো একটা জায়গা। বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটা যায়, মন ফ্রেশ লাগে সচরাচর তো কোথাও যাওয়া যায় না। নিজেদের পরিবারসহ এখানে আসা যায় প্রতিদিনই। একটু সময় কাটানো যায় এবং মনমানসিকতা ভালো থাকে। দূর থেকেও অনেক মানুষ আসে দেখতে। যদি এখানে এ-পার থেকে ও-পারে ব্রিজের ব্যবস্থা করা হতো হাতিরঝিলের মতো তা হলে আরও ভালো লাগত। জিনিসটা দেখতেও ভালো লাগত- সবাই তো এমনিতেই ‘মিনি হাতিরঝিল’ বলে- তা হলে ওটার মতোই হয়ে যেত।
ইতিহাসের পাতায় ঢাকার প্রথম সুবেদার ইসলাম খান কর্তৃক যাতায়াত ও জলাবদ্ধতা নিরসনে খননকৃত এই ধোলাইখাল কালের বিবর্তনে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর এই জলাধারের প্রাণ ফিরে আসায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ৩১ মে’র মধ্যে সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সঠিক সময়ে সম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে না পারলেও খুলে দেওয়া হয়েছে জনসাধারণের জন্য। প্রতিদিন বিকাল গড়াতেই নানা বয়সি মানুষের ঢল নামে লেকের পাড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ আলী সময়ের আলোকে বলেন, একসময় এখানে দুর্গন্ধে টেকা যেত না, আর এখন পরিবার নিয়ে বিকালে এখানে এসে বসি। পুরান ঢাকায় এমন একটা জায়গার খুব দরকার ছিল।
সম্প্রতি ৯ বছর বয়সি একটি শিশু তার বন্ধুদের সঙ্গে ধোলাইখালে মাছ ধরতে নেমে পানিতে পড়ে মারা গেছে। যার জন্য দুই সপ্তাহ ধরে এটি বন্ধ রাখা হয়।
তবে পুরোনো ঢাকার মতো জনবহুল এলাকায় এই সুন্দর পরিবেশ ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এর সর্বোচ্চ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ তদারকি সেল গঠন করা হচ্ছে। জলাধারে যাতে নতুন করে কোনো বর্জ্য বা পয়োঃসংযোগের ময়লা পানি না ঢুকতে পারে, সে জন্য নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। পাশাপাশি এটি পুরান ঢাকার একটি মূল ‘ফুসফুস’ ও বিনোদনকেন্দ্র হওয়ায় নাগরিকদেরও সচেতন থাকার এবং যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলার অনুরোধ জানিয়েছে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষা করে আধুনিক সব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে এই প্রকল্পে।
জলাধার ও ওয়াকওয়ে : ২ লাখ বর্গফুটের মূল লেকের চারপাশে প্রাতঃভ্রমণকারীদের জন্য তৈরি হয়েছে ১,৯৬৮ ফুট দীর্ঘ ওয়াকওয়ে।
সাইকেল লেন ও সবুজায়ন : পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের জন্য রয়েছে ২,১৫৫ ফুটের সাইকেল ট্র্যাক। এ ছাড়া ৬০ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে নান্দনিক গাছপালা লাগিয়ে পুরো এলাকাকে সবুজ চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
মুক্তমঞ্চ : সাংস্কৃতিক চর্চাকে বেগবান করতে নির্মিত হয়েছে দুটি উন্মুক্ত থিয়েটার। বড় মুক্তমঞ্চটিতে ৩৫০ জন এবং ছোটটিতে ১৫০ জনের বসার আধুনিক গ্যালারি রয়েছে।
শিশুদের জোন ও ফুড কোর্ট : শিশুদের নিরাপদে খেলার জন্য ২,১৩০ বর্গফুটের সুনির্দিষ্ট জোন এবং দর্শনার্থীদের খাবারের জন্য তৈরি হয়েছে আধুনিক ফুড কোর্ট।
মুঘল আমলে ঢাকার নগর পরিকল্পনা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ধোলাইখাল। ১৬০৮-১৬১০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার প্রথম সুবেদার ইসলাম খান চিশতী ঢাকাকে রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পর নগর রক্ষা, প্রশাসনিক সুবিধা এবং নৌ-যোগাযোগ উন্নত করার লক্ষ্যে এই খাল খননের উদ্যোগ নেন। সে সময় নদীনির্ভর বাংলায় নৌপথই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। তাই ধোলাইখাল শুধু একটি খালই ছিল না, বরং এটি ছিল রাজধানী ঢাকার জীবনরেখা।
ধোলাইখালের মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের সরাসরি নৌ-যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল। খালটি বালু নদীর তীরঘেঁষে প্রবাহিত হয়ে ফরিদাবাদের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে মিলিত হতো। ফলে পূর্ব ও উত্তর বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সহজেই নৌকাযোগে ঢাকায় আসা-যাওয়া সম্ভব হতো। এতে বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম অনেক সহজ হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক যতীন্দ্রমোহন রায় তার ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ধোলাইখালের একটি শাখা বাবুবাজারের কাছ দিয়ে বুড়িগঙ্গায় প্রবেশ করত। এই শাখা ঢাকার অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগকে আরও কার্যকর করে তুলেছিল। খালের দুই তীর ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে জনবসতি, বাজার এবং বিভিন্ন কারুশিল্পকেন্দ্র।
ধোলাইখাল শুধু যোগাযোগ বা বাণিজ্যের জন্যই ব্যবহৃত হতো না; এটি ঢাকার মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। বর্ষাকালে ফরাশগঞ্জ, নারিন্দা, মৈশুণ্ডি এবং আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা নৌকাযোগে এই খাল ধরে সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে পূজা দিতে যেতেন। সে সময় বর্ষার পানিতে খালটি পরিপূর্ণ থাকায় নৌযাত্রা ছিল সহজ, নিরাপদ এবং জনপ্রিয়। ধর্মীয় উৎসব ও পূজার সময় এই খাল দিয়ে অসংখ্য নৌকার চলাচল ঢাকার সামাজিক জীবনের এক পরিচিত দৃশ্য ছিল।
এ ছাড়া ধোলাইখাল নগর প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। খালটি প্রাকৃতিক পরিখার মতো কাজ করত, যা রাজধানীকে বহিরাগতদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করত। একই সঙ্গে জলনিষ্কাশনের ব্যবস্থাও উন্নত করত, ফলে বর্ষাকালে শহরের জলাবদ্ধতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে থাকত।
কালের প্রবাহে নগরায়ণ, অবৈধ দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ধোলাইখালের অধিকাংশ অংশ আজ বিলুপ্ত বা সংকুচিত হয়ে গেছে। একসময়ের প্রশস্ত ও প্রাণবন্ত এই জলপথ এখন অনেক স্থানে সরু নালা বা ড্রেনে পরিণত হয়েছে। তবু ধোলাইখাল ঢাকার ইতিহাস, নগর পরিকল্পনা এবং ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে আজও গবেষক ও ইতিহাসবিদদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কেবল একটি খাল রক্ষার বিষয় নয়; বরং এটি ঢাকার চারশ বছরের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও নগর স্মৃতি সংরক্ষণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সময়ের আলো/এসএকে