নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বৈঠাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় দেড়মাস থেকে সামিয়ানার নিচে পাঠদান চলছে। শ্রেণিকক্ষ সংকট ও রোদ-বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে বিদ্যালয়ের ১৪৬ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। দ্রুত বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীরা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বিশা ইউনিয়নের বৈঠাখালী গ্রামে ১৯৬২ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। চার কক্ষবিশিষ্ট ভবনটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪৬ জন। এরমধ্যে ছাত্র ৬৯ জন এবং ছাত্রী ৭৭ জন। যেখানে পাঁচজন শিক্ষক এবং তিনজন কর্মচারী রয়েছেন। এ বিদ্যালয়ে বৈঠাখালি, ডুবাই, তেজনন্দী ও উদয়পুর গ্রামের শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৬ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে।
সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের চত্বরে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। সেখানে শিশু ও তৃতীয় শ্রেণির প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থীদের আলাদা ভাবে পাঠদান করছেন দুই শিক্ষক। গুমোট আবহাওয়ায় যেন হাঁসফাঁস অবস্থা। পাশেই আরেকটি টিন শেডের ছোটকক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের জন্য পাশেই অপেক্ষা করছেন।
বিদ্যালয়ের ভবনটি প্রায় ৩২ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ে এ ভবনটি এখন ছাদ, বিম ও দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে ভেতরের রড বেরিয়ে এসেছে। ভবনের খুঁটি ও দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
গত ২৩ জুন ক্লাস চলাকালে একটি কক্ষের বিমের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে দুই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ভবনটি পরিত্যক্ত করে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। তারপর কয়েক দিন বারান্দা ও খোলা আকাশের নিচে পাঠদান চালানো হয়। তবে কক্ষের সংকট থাকায় এখনো জরাজীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের একটি কক্ষে ঝুঁকি নিয়ে অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে শিক্ষকদের। আর বিদ্যালয়ের মাঠে টিনশেড দিয়ে কক্ষ নির্মাণের কাজ চলছে।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহজাবিন সিনহা বলেন, কয়েকদিন আগে ক্লাস হচ্ছিল। হঠাৎ করে বিমের পলেস্তার খসে সহপাঠি ফায়সাল ও সাইদ এর মাথায় পড়ে। তারপর থেকে আমরা ভয়ে আছি।
প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু হোজায়ফা ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়ম খাতুন বলেন, বৃষ্টি হলে বইপত্রসহ গা ভিজে যায়। আবার সামিয়ানায় ফ্যান না থাকায় প্রচণ্ড গরমে ঘেমে যেতে হচ্ছে। আমরা ঠিকমতো পড়াশুনা করতে পারছিনা।
এলাকাবাসী মজিবর রহমান, হাফিজুল ইসলাম ও অভিভাবক আব্দুস সালাম বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের করুন অবস্থা। কচিকাচা বাচ্চারা এখানে লেখাপড়া করে। কিছুদিন আগে দুই বাচ্চারা মাথায় পলেস্তার খুলে পড়ে আহত হয়। আবার অভিভাবকরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতে হয়। বিদ্যালয়ের একটি নতুন ভবন খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
সহকারী শিক্ষিকা মোছা. মাহবুবা খাতুন বলেন, বর্ষাকাল হওয়ায় এখন বেশি সমস্যা পড়তে হয়েছে। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। সামিয়ানার নিচে মাটিতে পানি জমে কাঁদা হচ্ছে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে শিক্ষার্থীরাও ভিজে যাচ্ছে, সাথে আমরাও। সামিয়ানায় ফ্যানের ব্যবস্থা করা সম্ভব না। প্রচণ্ড গরমে ক্লাস করায় শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এখন পড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমৃত কুমার সরকার বলেন, ফলাফলের দিক দিয়ে উপজেলার মধ্যে প্রতিবছর আমাদের অস্থান দ্বিতীয় ও তৃতীয়। ভবনটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায়ই ছাদের পলেস্তার খুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গায়ে পড়ত। অথচ একটি ভবনের অভাবে আমরা দীর্ঘ বছর থেকে বঞ্চিত। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনেকবার জানানো হয়েছে, কিন্তু কোন কাজেই আসেনি। তবে দুর্ঘটনার পর কিছুটা টনক নড়েছে। বর্তমানে সামিয়ানার নিচে পাঠদান করতে হচ্ছে। কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে পরিত্যক্ত ভবনেই অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে টিন শেডের তিনটি কক্ষ নির্মাণের বরাদ্ধ দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। কাজ শেষ হতে কয়েকদিন সময় লাগবে।
আত্রাই উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. মাযহারুল ইসলাম বলেন, উপজেলায় ১৩০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রাথমিক ভাবে একটি বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আর কোন ভবনের সমস্যা আছে কিনা তা জানতে শিক্ষকদের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ভবনের বিমের পলেস্তার খসে পড়ায় দুইজন ছাত্র আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। বিষয়টি জানার পর ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বিকল্প মাধ্যম হিসেবে বাইরে তাবু (সামিয়ানা) টাঙিয়ে পাঠদানের পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া তাৎক্ষণিক অস্থায়ী ভাবে টিনশেডের তিনটি কক্ষ তৈরি করে পাঠদানের জন্য উপজেলা থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/আতা