ভারতের নয়াদিল্লিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হাসিনার বিতর্কিত ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের উপস্থাপক সাতক্ষীরার ছেলে আবু ওবায়দা অরিনকে (২৫) নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা ও গুঞ্জন।
সেই অনুষ্ঠানে অরিনের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনুষ্ঠানে অরিন জুলাই আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়েও কটূক্তি করেন তিনি।
অরিন সাতক্ষীরা সদর থানার পাশে মুনজিতপুর লিচুতলা এলাকার বাসিন্দা। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি বর্তমানে ভারতে আছেন।
সাধারণ একটি ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান অরিন কীভাবে শেখ হাসিনার এত কাছাকাছি পৌঁছালেন এবং এমন হাই-প্রোফাইল অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হলেন, তা নিয়ে সাতক্ষীরা জুড়ে চলছে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন।
শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি তরুণের সঞ্চালনা এবং ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কর্মসূচির অনুমতির বিষয়টি ঢাকা-নয়াদিল্লি কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া আয়োজিত শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল কনফারেন্সে আবু ওবায়দা অরিন মঞ্চে উপস্থিত ৬ জন গুরুত্বপূর্ণদের একজন ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা করছেন।’
তিনি সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থাও পর্যালোচনা করেন এবং দেশের অন্তবর্তীকালীন ও রাজনৈতিক কাঠামোর সমালোচনা করেন।
উক্ত কনফারেন্সের মূল মঞ্চে অরিন ছাড়াও ভারতের সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে বাংলাদেশের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক কূটনীতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমিনুল হক পলাশ, সজীব ওয়াজেদ জয়সহ ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
অরিনের বাবা আবু সোয়েব এবেল জানান, তার ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে তার জানা ছিল না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখে তিনি ছেলেকে চিনতে পারেন। ছেলের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অরিন সাধারণত তার মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে।’
অরিনের মা জেবুন্নেছা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলেকে পড়াশোনা করার জন্যই দিল্লিতে পাঠিয়েছিলাম। সে অত্যন্ত মেধাবী। রাজনীতিতে না জড়ানোর জন্য তাকে বারবার অনুরোধ করেছি। কিন্তু ৫ আগস্ট অনলাইনে তার ছবি দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। ঘটনার পর তার সঙ্গে একবার কথা হলে, আমার কান্নার শব্দ শুনে সে আমাকে শান্ত থাকতে বলে ফোন কেটে দেয়। ছেলেকে নিয়ে অন্যরকম স্বপ্ন ছিল, যা আজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কীভাবে কী হলো, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
এলাকার বাসিন্দা ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর কৌতূহল।
স্থানীয় মুদি দোকানি শাহজাহান জানান, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে অরিনকে এলাকায় দেখা যায়নি।
অন্য এক প্রতিবেশী নয়াদিল্লির অনুষ্ঠানের ছবি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এ তো আমাদের অরিন! বড় নেতা হয়ে গেছে দেখছি, একেবারে সাবেক মন্ত্রীদের পাশে বসে অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে!’
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, সাতক্ষীরা-২ (সদর) আসনের সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবির সঙ্গে অরিনের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। তবে একটি সাধারণ পরিবারের তরুণ কীভাবে এত দ্রুত শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংস্পর্শে পৌঁছালেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
অবশ্য, অরিনের মামি লায়লা পারভীন সেজুতি শেখ হাসিনার শেষ আমলে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। শেখ হাসিনার পতনের পরে তিনি বিভিন্ন মামলায় বর্তমানে কারাগারে আছেন। এছাড়া, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ ইফতেখার আলী, অরিনের খালু।
বহুল আলোচিত ও সংবেদনশীল একটি জাতীয় রাজনৈতিক ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে সাতক্ষীরার এই তরুণের নাম উঠে এলেও, বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেনি।
সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তারা আগে থেকে অবগত ছিলেন না। তবে, ওই তরুণের ব্যাকগ্রাউন্ড ও সার্বিক তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে এবং এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/মহু