রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার প্রবণতা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্যে দেখা যায়, গত ছয় অর্থবছরে এ কেন্দ্র থেকে সেবা নিয়েছেন ৩ হাজার ৫৮ জন।
তবে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় কাউন্সিলর ও জনবল না থাকায় কাক্সিক্ষত মাত্রায় সেবা দেওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কেন্দ্রটির দায়িত্বশীলরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বিষণ্নতা, উদ্বেগসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কেন্দ্রটির ওপর চাপও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
এ বিষয়ে মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ইন্টার্নি কো-অর্ডিনেটর (অবৈতনিক) মেহেদী হাসান বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ২০ জন, অনেক সময় ২৫ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী কাউন্সিলিং নিতে আসেন। শুরুতে তাদের দিয়ে গোপনীয় তথ্যফরম পূরণ করানো হয়। এরপর একাধিক সেশনের মাধ্যমে সমস্যার ধরন শনাক্ত করা হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ইন্টার্নি কো-অর্ডিনেটর (অবৈতনিক) মেহেদী হাসান আরও বলেন, কাউন্সিলর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না; বরং সম্ভাব্য বিভিন্ন পথ দেখিয়ে শিক্ষার্থীকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে সহায়তা করেন। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করেন। কাউন্সিলিং নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কয়েকটি সেশন শেষে উল্লেখযোগ্য উন্নতি অনুভব করেন। তীব্র বিষণ্নতা কিংবা গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ওষুধের প্রয়োজন হয়। তখন তাদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়। তবে সেবার চাহিদা বাড়লেও জনবল সংকট কেন্দ্রটির কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একজন ইন্টার্ন কো-অর্ডিনেটর ও তিনজন ইন্টার্নের মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং তারা সবাই অবৈতনিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে সেবামূলক সকল কাজই আমাকেই করতে হয়। এমনকি পিওনের কাজটাও আমাকে আমার একা করতে হয়। যার ফলে সঠিক সেবাটা আমার দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক ও মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এনামুল হক বলেন, বর্তমানে কেন্দ্রে একজন কাউন্সিলর এবং সমন্বয়ের দায়িত্বে কয়েকজন ইন্টার্ন কাজ করছেন। তারা নামমাত্র ভাতা বা প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দিচ্ছেন। ফলে জনবল সংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, স্থায়ীভাবে কাউন্সিলর, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা আরও কার্যকর ও মানসম্মত সেবা পাবেন। আগের প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হলেও বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রশাসনিক ইউনিটের মতো মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকেও স্থায়ী কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। কারণ বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বাজেট প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছিল। ফলে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ হয়নি। তিনি আরও বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প (ডিপি) বা বিশেষ বরাদ্দ পাওয়া গেলে কেন্দ্রটিকে আধুনিকায়ন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা সম্ভব হবে। তা সম্ভব না হলে আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আত্মহত্যার ঘটনা বাড়াচ্ছে উদ্বেগ : মানসিক স্বাস্থ্যসংকটের এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
প্রকাশিত তথ্যগুলোতে দেখা যায়, এ সব ঘটনার পেছনে বিভিন্ন ধরনের মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত চাপের বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক সংকট, একাকিত্ব, আর্থিক চাপ, ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ২০২৫ সালে হেলথ সায়েন্স রিপোর্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে উচ্চমাত্রার, ২৯ শতাংশের মধ্যে মাঝারি মাত্রার এবং ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে নিম্নমাত্রার আত্মহত্যাপ্রবণতা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সম্পর্কে অধ্যাপক এনামুল হক বলেন, আত্মহত্যা একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। শিক্ষাজীবনের চাপ, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং জীবনের লক্ষ্য অর্জনের উদ্বেগ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপে রাখছে।
মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব বলেন, এটি শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়; বরং সারাদেশের একটি উদ্বেগজনক সমস্যা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়, স্কুলপড়ুয়া শিশুরাও আত্মহত্যার মতো ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব, পরিবারের সঙ্গে সময় ও যোগাযোগ কমে যাওয়া এবং সহনশীলতার অভাব এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সমাধানের বিষয়ে অধ্যাপক এনামুল হক বলেন, যেসব পরিবারে বিষণ্নতা বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো গুরুতর মানসিক রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের দ্রুত চিকিৎসা ও নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে সেবা নিয়েছিলেন ২৩২ জন। পরের অর্থবছরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৮ জনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য কমে তা হয় ৫২৩। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৪৩ জন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৪৯ জন সেবা নেন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা আরও বেড়ে ৬৭৩ জনে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ ছয় বছরে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ছয় বছরে সেবা নেওয়া ৩ হাজার ৫৮ জনের মধ্যে ১ হাজার ৪৩৭ জন ছাত্র, ১ হাজার ৪২৩ জন ছাত্রী, ১০১ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ৯৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এদের মধ্যে ২ হাজার ৫৪১ জনকে দেওয়া হয়েছে স্বতন্ত্র কাউন্সিলিং সেবা যেখানে তারা মোট ১০ হাজার ১৫২টি ব্যক্তিগত সেশন নিয়েছেন। পাশাপাশি ১ হাজার ৩৯৭ জনকে ২৬৪টি দলগত সেশন দেওয়া হয়েছে। তবে নিবন্ধনের পরও ৩০২ জন কোনো সেশন গ্রহণ করেননি।
মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, প্যানিক ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি), সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, অমূলক ভীতি, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ, আত্মহত্যাপ্রবণ চিন্তা, রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, মাদকাসক্তি ও অটিজমসহ নানা ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এ সব সমস্যার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমস ও পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি, মাদকসেবন, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, যৌন হয়রানি, শৈশবের মানসিক আঘাত, পরীক্ষায় খারাপ ফল, একাকিত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির মতো ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক কারণ কাজ করছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রটি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে