সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা জোট আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করছে আঙ্কারা। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, জোটটি তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োজনে আরও দেশকে এর আওতায় আনা হবে।
গত শুক্রবার মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
চুক্তিতে কী আছে?
চুক্তিটির মূল বৈশিষ্ট্য হলো— তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে এর কিছুটা মিল রয়েছে। তবে হামলার ক্ষেত্রে কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে, তা পরিস্থিতি অনুযায়ী আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হবে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
সৌদি ও তুরস্কের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই চুক্তি কোনো বিদ্যমান জোট বা সম্পর্কের বিকল্প নয়। তুরস্কও জানিয়েছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি, এমনকি ইরানকেও নয়।
প্রথম সম্ভাব্য দেশ মিসর
চুক্তিতে পরবর্তী সময়ে কোন দেশ যোগ দিতে পারে— এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাক্ষরকারী দেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি দেশের নামই বলা হয়েছে। সেটি হলো মিসর। হাকান ফিদান মিসরকে ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার প্রত্যাশা, কিছু কারিগরি বিষয় সমাধান হয়ে গেলে কায়রোও আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেবে।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ের অধ্যাপক আলি বাকিরের মতে, মিসর যুক্ত হলে জোটটির রাজনৈতিক গুরুত্ব, আঞ্চলিক প্রভাব ও কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
কেন মিসরের সিদ্ধান্ত সহজ নয়?
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মিসরের ইতোমধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে দেশগুলো ‘আর-৪’ নামে একটি পরামর্শমূলক প্ল্যাটফর্মেও কাজ করে। তুরস্কের সঙ্গে অতীতে মতবিরোধ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে মিসরের সামরিক সম্পর্কও আঙ্কারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাধ্যতামূলক সামরিক প্রতিশ্রুতির কারণে মিসর জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে পারে। কারণ, তিন অংশীদারের স্বার্থ সবসময় কায়রোর স্বার্থের সঙ্গে এক নয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিসরের সম্পর্ক এবং বিদ্যমান শান্তিচুক্তিগুলোর বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির সহযোগী ফেলো করিম এলগেন্ডির মতে, মিসর এমন একটি চুক্তিতে যোগ দিতে পারে, যদি এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক ও বিদ্যমান জোট-শান্তিচুক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং কখন ও কোথায় সামরিকভাবে জড়াবে, সে বিষয়ে কায়রোর স্বাধীনতা বজায় থাকে।
তার মতে, চুক্তিটি যদি রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে থাকে এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়ার সুযোগ আলাদাভাবে নির্ধারণ করা যায়, তাহলে মিসর এতে যোগ দিতে পারে। কিন্তু এটি যদি এমন বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়, যা মিসরকে অন্য কোনো দেশের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে, তাহলে কায়রো সম্ভবত সরে থাকবে।
উপসাগরের আরও দেশ কি যুক্ত হবে?
মিসরের পাশাপাশি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) অন্য দেশগুলোকেও ভবিষ্যতে জোটে যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। জিসিসির সদস্য সৌদি আরব ছাড়াও রয়েছে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসেম আল থানি আশা প্রকাশ করেছেন, জিসিসির সব সদস্যই উদ্যোগ নিয়ে এই চুক্তিতে যোগ দেবে।
হাকান ফিদানও জানিয়েছেন, কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে তিনি সেসব দেশের নাম প্রকাশ করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, কাতার ও কুয়েত হতে পারে পরবর্তী সম্ভাব্য সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
করিম এলগেন্ডির মতে, তিন স্বাক্ষরকারী দেশের সঙ্গেই কাতার ও কুয়েতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশই নতুন করে ভাবছে।
কাতারকে জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ‘স্বাভাবিক’ উপসাগরীয় প্রার্থী হিসেবে দেখছেন আলি বাকির। তার মতে, কুয়েতও সম্ভাব্য সদস্য। পাশাপাশি আজারবাইজান, সিরিয়া ও জর্ডান তুলনামূলক দ্রুত এই জোটে যোগ দিতে পারে।
তবে জোটটি শেষ পর্যন্ত একটি বড় আঞ্চলিক সামরিক ব্লকে পরিণত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। করিম এলগেন্ডির মতে, এটি সম্ভবত এমন একটি ‘ইচ্ছুক দেশগুলোর জোট’ হিসেবে বিস্তৃত হবে, যেখানে প্রতিটি দেশ নিজেদের নিরাপত্তা ও ঝুঁকির হিসাব অনুযায়ী আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নেবে।
সময়ের আলো/কেএইচ