একজন নারীর পরিচয় শুধু তার উচ্চশিক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার স্বপ্ন আর ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে এক নতুন পরিচয়। মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর আত্মনির্ভরশীল হওয়ার তাগিদে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাফিনাজ আক্তার। একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে ভালোই কাটছিল দিনগুলো। কিন্তু ২০২০ সালের বৈশ্বিক মহামারি করোনা এসে এক মুহূর্তে থমকে দেয় সবকিছু। চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে পড়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে জয় করার নামই তো নারী! শিক্ষকতা বন্ধ হলেও সাফিনাজের ভেতরের সৃজনশীলতা থেমে থাকেনি। বন্দিজীবনে পরিবারকে নতুন নতুন সুস্বাদু খাবার রান্না করে খাওয়ানো শুরু করেন তিনি। তার হাতের রান্নার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে ছোট ভাই মিরাজ এক দিন হুট করেই প্রস্তাব দেয়, ‘আপু, তোমাকে একটা ফুড পেজ খুলে দিই?’ ভাইয়ের সেই আগ্রহ আর অনুপ্রেরণাতেই সূচনা হয় এক নতুন অধ্যায়ের। সাফিনাজের রান্নার প্রতি ভালোবাসাকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে ছোট ভাই খুলে দেন একটি ফেসবুক পেজ- ‘দ্য সাফিনাজেস কিচেন’।
উদ্যোক্তা হওয়ার রাস্তাটা কখনোই খুব সহজ ছিল না। তবে এই পথচলায় সাফিনাজ পাশে পেয়েছিলেন পরিবারকে। সাফিনাজ আক্তার বলেন, আমার স্বামী সবসময় আমাকে সাপোর্ট করেছে যে তুমি নিজে কিছু করো, নিজের পরিচয় তৈরি করো, কোনো কাজে মন খারাপ হলে বা ভেঙে পড়লে আমাকে খুব সাহস দেন। যার জন্য আমি কখনো মনোবল হারাই না। একই সঙ্গে আমার মা যার জন্য আমি আজ এখানে আসতে পেরেছি, কাজের শুরু থেকে সাহস আর মনোবল দিয়েছেন। আরেকজন আমার বড় ভাইয়া যে সুদূর প্রবাসে থেকেও সবসময় আমার বিজনেসের খবর রেখেছেন, সাহস দিয়েছেন দূর থেকে, ভাইয়ার কাছে আমি অনেক কৃতজ্ঞ।
পরিবারের সমর্থনে তিনি ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে থাকেন। রান্নার ব্যবসার ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি হলো খাবারের মান ও স্বাদ। সাফিনাজের নীতি- খাবারের মান হতে হবে একশতে একশ। আর তাই পেজের শুরু থেকেই তিনি কোনো আপস করেননি। যেখানে যে পণ্যের মান সবচেয়ে ভালো, সেখান থেকেই সরাসরি কালেকশন করেন তিনি। দীর্ঘদিনের এই নিষ্ঠার ফলে আজ পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তৈরি হয়েছে এক গভীর বিশ্বাস ও প্রগাঢ় সম্পর্ক।
যেকোনো উদ্যোগের শুরুটা হয় চেনা মানুষদের হাত ধরে। সাফিনাজের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শুরুতে আত্মীয়স্বজন ও কাছের মানুষদের অর্ডার পেলেও ধীরে ধীরে তার রান্নার স্বাদ ও সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশে। আজ শুধু দেশেই নয়, সুদূর প্রবাস থেকেও বহু ভাই-বোন তাদের দেশে থাকা প্রিয়জনদের জন্য সাফিনাজের পেজে ভালোবাসার অর্ডার পাঠান। প্রবাসীদের এই বিশ্বাসকে আমানত হিসেবে দেখে অত্যন্ত যত্ন ও ভালোবাসার সঙ্গে খাবার পৌঁছে দেয় দ্য সাফিনাজেস কিচেন।
সাফিনাজের কাছে এটি কেবল একটি ব্যবসা নয়, এক অদম্য স্বপ্ন পূরণের আকাক্সক্ষা। যে স্বপ্ন তাকে আরও অনেক দূর নিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়। সাফিনাজ আজ গর্ব করে বলতে পারেন, ‘আমার উদ্যোগ এখন আমার সম্মান, আমার পরিচয় এবং আমার অস্তিত্ব।’ আজ তার প্রতিষ্ঠান হয়তো আকারে ছোট, কিন্তু সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে বেশ কিছু তরুণ-তরুণীর। নিজের হাত ধরে অন্যদের মুখে হাসি ফোটানো এবং কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়াকে জীবনের বড় অর্জন মনে করেন তিনি।
এই যাত্রাপথে সাফিনাজের মূল শক্তি তার গ্রাহকরা। যারা শুধু খাবার অর্ডার করেই ক্ষান্ত হননি, বরং প্রতিটি খাবারের প্রশংসা ছড়িয়ে দিয়েছেন অন্যদের মাঝেও। কাস্টমারদের ভালোবাসা ও রিভিউ সাফিনাজকে প্রতিদিন নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।
সাফিনাজ আক্তার প্রমাণ করেছেন, সংকট মানেই শেষ নয়- সংকট মানে নতুন কোনো সম্ভাবনার সূচনা। দ্য সাফিনাজেস কিচেনকে এক দিন সাফল্যের শিখরে নিয়ে যাবেন, এটিই তার মূল লক্ষ্য। একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি সবার কাছে দোয়া ও ভালোবাসা প্রার্থী। সাফিনাজের এই পথচলা হোক দেশের হাজারো নারীর প্রেরণার উৎস।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি