১৭ ঘন্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না গাইবান্ধায়, বিপর্যস্ত জনজীবন

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

সারাদেশ

রাত তখন ১ টা। থানাপাড়ার আনিসুজ্জামানের ঘরে ফ্যান বন্ধ হয়ে যায় মাঝরাতে। ঘড়ি ধরে বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার হিসাব তিনি এখন মুখস্থ

2026-08-12T15:50:02+00:00
2026-08-12T15:51:18+00:00
 
  বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬,
২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
১৭ ঘন্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না গাইবান্ধায়, বিপর্যস্ত জনজীবন
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৫০ পিএম  আপডেট: ১২.০৮.২০২৬ ৩:৫১ পিএম
গাইবান্ধা জেলা শহর। ছবি : সময়ের আলো
রাত তখন ১ টা। থানাপাড়ার আনিসুজ্জামানের ঘরে ফ্যান বন্ধ হয়ে যায় মাঝরাতে। ঘড়ি ধরে বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার হিসাব তিনি এখন মুখস্থ বলতে পারেন- এক ঘণ্টা থাকলে পরের এক ঘণ্টা থাকে না। দিনে-রাতে মিলিয়ে অন্তত ১২ ঘণ্টা তার ঘরে বিদ্যুৎ থাকছে না। ফ্রিজের খাবার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটে, অন্যদিকে চার্জার ফ্যান বা আইপিএস- কোনোটাই ঠিকমতো চার্জ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।

আনিসুজ্জামানের এই দুর্ভোগ তার একার নয়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গাইবান্ধার ৭ উপজেলার জনজীবন। শহরে তুলনামূলক কম, দিন-রাত মিলিয়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের চিত্র আরও ভয়াবহ- সেখানে ১২ থেকে ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ মানুষের ভোগান্তি যেন শেষ হচ্ছে না। থমকে যাচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যও।

সমস্যাটা শুধু গাইবান্ধার নয়, এর শিকড় জাতীয় গ্রিডের সংকটে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত রোববার বেলা তিনটায় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট এবং সোমবার রাত একটায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে।


সংকটের সূত্রপাত গত ২১ জুলাই, যেদিন মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি বিকল হয়ে পড়ে। যদিও পরবর্তীতে টার্মিনালটি আংশিকভাবে সচল হয়েছে, তবু গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফেরেনি। ফলে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াট থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ডের আদানি কেন্দ্র থেকে সরবরাহ ৪০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমে যাওয়া এবং ফার্নেসওয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন হ্রাস।

গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রকৃত চাহিদার দ্বিগুণ হলেও জ্বালানি সংকটে ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বাধ্য হয়ে লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই লোড সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। বিভাগীয় ও জেলা শহরে অল্প লোডশেডিং দিয়ে, গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (নেসকো) গাইবান্ধার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, জেলায় নেসকোর অধীনস্থ ফিডারগুলোর মোট চাহিদা ২০ থেকে ২৪ মেগাওয়াট, তবে দৈনিক সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ১০ থেকে ১২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে শুধু শহরের চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট হলেও মিলছে সাড়ে আট থেকে নয় মেগাওয়াট।

অন্যদিকে গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা যায়, গ্রামাঞ্চলে বর্তমান দৈনিক চাহিদা ৬০ থেকে ৬৫ মেগাওয়াট হলেও গড়ে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, চাহিদার প্রায় অর্ধেক ঘাটতি নিয়েই দিন পার করছে গ্রামীণ জনপদ।


তবে বিদ্যুৎ গ্রাহকরা বলছেন, নেসকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দেওয়া চাহিদা-সরবরাহের এই সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তব চিত্র আরও অনেক বেশি নাজুক।

জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিধিও ভিন্ন- শহর এলাকায় সরবরাহ করে নেসকো, আর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সরবরাহের দায়িত্বে গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। তবে, দুক্ষেত্রেই চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে।

দিনের গরমের পর রাতেও রেহাই মিলছে না বাসিন্দাদের। স্থানীয়রা বলছেন, দিনের বেলা কয়েক দফা বিদ্যুৎ যাওয়ার পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘ সময় সরবরাহ বন্ধ থাকছে। কখন বিদ্যুৎ যাবে ও কখন আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন গ্রাহকেরা। বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক পরিবারকে ঘরের বাইরে, বারান্দায় কিংবা খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এই ভোগান্তির সবচেয়ে বড় শিকার শিশু ও বয়স্করা।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে রাতের লোডশেডিংয়ে। আলো ও তীব্র গরমের কারণে পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে নিয়মিত পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী- কেউই স্বাভাবিকভাবে পড়তে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।


বিদ্যুৎনির্ভর ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও পড়েছে লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব। কম্পিউটার, ফটোকপি, প্রিন্টিং প্রেস, অনলাইন সেবা, ছোট কারখানা- বিদ্যুৎ না থাকলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে একদিকে যেমন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, তেমনি জেনারেটর বা আইপিএসের মতো বিকল্প ব্যবস্থার পেছনে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এই বাড়তি খরচের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর, যাদের বিকল্প বিনিয়োগের সামর্থ্য সীমিত।

নেসকো ও গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রাহকদের অভিযোগ, ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ঘরের বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম বারবার থমকে যাচ্ছে। এছাড়া, প্রচণ্ড গরমে ঘরে অবস্থান করাই কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। শহরের তুলনায় গ্রামের পরিস্থিতি বেশি ভয়াবহ।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু সে অনুপাতে সরবরাহ মিলছে না। তবে তাদের আশ্বাস, দু-এক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

তবে, এই আশ্বাস নতুন নয়। জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এলএনজি টার্মিনালের পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরা এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গাইবান্ধাসহ দেশের প্রান্তিক জনপদগুলোর এই দুর্ভোগ কতটা কমবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে বাসিন্দাদের মধ্যে।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   বিদ্যুৎ  গাইবান্ধা  বিপর্যস্ত  জনজীবন  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: