বাবাকে হারিয়ে আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি। বাবার সঙ্গে নিজের দীর্ঘ পথচলা, ফুটবল ক্যারিয়ারে তার অবদান এবং শেষ সময়ে পাশে থাকতে না পারার আক্ষেপ তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হৃদয়স্পর্শী বার্তা দিয়েছেন মেসি।
মেসি লিখেছেন, ‘বাবা, তুমি যে আর নেই, এটা আমি এখনও বিশ্বাসই করতে পারছি না। বিষয়টা যেন মনের গভীরে ঠিকভাবে গেঁথে বসছে না। অথবা বলা ভালো, আমি হয়তো তা মেনে নিতেই চাইছি না। এটা ভাবতেই খুব কষ্ট হচ্ছে যে তোমাকে আর দেখতে পাব না, আমাদের আর কোনোদিন কথা হবে না।’
বাবার শারীরিক কষ্টের কথা উল্লেখ করে মেসি বলেন, তিনি জানতেন তার বাবা অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন। তাই এই পরিণতি হয়তো তার জন্য ভালোই ছিল। তবে এত দ্রুত বাবাকে হারাতে হবে, তা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। একসঙ্গে উপভোগ করার মতো আরও অনেক কিছুই বাকি ছিল বলে আক্ষেপ করেন তিনি।
বিশ্বকাপের প্রসঙ্গও স্মরণ করেছেন মেসি। তিনি জানান, গত বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার জন্য তার বাবা বারবার বলেছিলেন। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর কয়েক দিন আগে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। মেসির ভাষায়, সেটিই ছিল কোনো টুর্নামেন্টে বাবার প্রথম অনুপস্থিতি।
তখন মেসির মা তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তার বাবার অবস্থার উন্নতি হবে এবং তিনি ভ্রমণের জন্য সুস্থ হয়ে উঠবেন। মেসিও বাবাকে বলেছিলেন, তারা ফাইনালে উঠবে, যাতে তিনি পরে সেই সফরে যেতে পারেন।
‘প্রতিটি ম্যাচের পর আমি তোমার বার্তার জন্য অপেক্ষা করতাম এবং তা খুব অনুভব করতাম। তখনই বুঝেছিলাম, পরিস্থিতি সত্যিই কতটা খারাপ।’
মেসি জানান, বাবার সঙ্গে যোগাযোগের সেই অভ্যাসের অনুপস্থিতিই তাকে পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে সাহায্য করেছিল। তবু তিনি টুর্নামেন্টে যতটা সম্ভব এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, যাতে কিছুটা সময় পাওয়া যায় এবং তার বাবা অন্তত একটি ম্যাচ দেখতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত তারা ফাইনালে পৌঁছালেও বাবা সেখানে থাকতে পারেননি। মেসির ইচ্ছা ছিল ট্রফি জিতে সেটি বাবার সামনে তুলে ধরার। কিন্তু শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি নিজের সেরাটাও দিতে পারেননি।
মেসি বলেন, তিনি যখন বাবার কাছে পৌঁছান, তখন তার বাবা ভেবেছিলেন, পেনাল্টি শুটআউটে তারা ফাইনাল হেরে গেছে। কিন্তু সেই ম্যাচ কিংবা টুর্নামেন্ট নিয়ে তাদের আর কথা বলা হয়নি। বাবার শেষ সময়ে তিনি নিজের সাফল্যের সেই মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিতে পারেননি।
‘আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি ম্যাচ আমরা কতটা উপভোগ করেছি, তা তোমার ধারণারও বাইরে। আবারও প্রমাণিত হলো, তোমার কথাই ঠিক ছিল। আমার সেখানে থাকা এবং খেলাটা জরুরি ছিল।’
বাবার সঙ্গে প্রতিদিনের যোগাযোগের কথাও স্মরণ করেছেন মেসি। তার ভাষায়, দুজনের মধ্যে এমন কোনো বিষয় ছিল না, যা অজানা ছিল। ব্যস্ততার মাঝেও সুযোগ পেলেই তারা একে অপরের সঙ্গে দেখা করতেন।
মেসি আরও লিখেছেন, ‘তোমাকে ছাড়া আমি কী করব, কীভাবে সামনে এগিয়ে যাব, তা জানি না। আমি তো কেবল ফুটবলই খেলেছি। এখন মনে হচ্ছে, হয়তো আর বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারব না।’
শৈশব থেকে ফুটবলার হয়ে ওঠার পুরো যাত্রায় বাবার ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন মেসি। অফিস থেকে ফিরেই বাবা তাকে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন। ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় তার মা-ও এই দায়িত্ব পালন করতেন। মেসির কোনো ম্যাচই বাবা কখনো মিস করতেন না।
মেসির কাছে তার বাবা ছিলেন একই সঙ্গে বাবা, বন্ধু ও প্রতিনিধি। পরিস্থিতির প্রয়োজনে তিনি সব ভূমিকাই পালন করেছেন। মতের অমিল বা তর্ক হলেও শেষ পর্যন্ত বাবার পরামর্শই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
সন্তানদের বড় করার ক্ষেত্রেও বাবার শিক্ষা অনুসরণ করার কথা জানিয়েছেন মেসি। তিনি বলেন, নিজের সন্তানদেরও ঠিক সেভাবেই বড় করছেন, যেভাবে তার বাবা ও মা তাকে বড় করেছিলেন।
বাবাকে উদ্দেশ করে মেসির শেষ কথাগুলো ছিল আরও আবেগঘন, ‘তোমাকে ভীষণ মিস করব। তবে তুমি সবসময় আমার সঙ্গেই থাকবে, বিশেষ করে আমার সন্তানদের বড় করে তোলার ক্ষেত্রে। কারণ আমি তাদের ঠিক সেভাবেই শেখাচ্ছি ও বড় করছি, যেভাবে তুমি আর মা আমাকে বড় করেছিলে।’
বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মেসি লিখেছেন, ‘শান্তিতে থেকো। পৃথিবীতে যেমন আমাদের আগলে রাখতে, ওপর থেকেও ঠিক সেভাবেই আমাদের ওপর নজর রেখো।’
‘সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। ভালোবাসি, বাবা।’❤️
সময়ের আলো/এমকে