চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরের কর্মকর্তা ও প্রধান পদ শূন্য। ফলে, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও জনসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, উপজেলার শতাধিক বিদ্যালয়ে নেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। কিছু বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, কিছু বিদ্যালয়ে সেই ব্যবস্থাও নেই। এতে শিক্ষার পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দফতর ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে, একদিকে যেমন দাফতরিক কাজের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তদারকি ও দ্রুত বাস্তবায়নেও তৈরি হচ্ছে জটিলতা।
মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদে বর্তমানে সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, বিআরডিবি কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও), মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, দুজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, আইসিটি কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি সার্জন এবং বন বিভাগের কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে।
এসব দফতরের কোনো কোনোটি অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা নিজ কর্মস্থলের পাশাপাশি মতলব উত্তরের দায়িত্ব পালন করায়, নিয়মিত অফিস করতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে সপ্তাহে মাত্র এক থেকে দুদিন সংশ্লিষ্ট উপজেলায় উপস্থিত থাকার অভিযোগও রয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ দাফতরিক সিদ্ধান্ত, সেবা প্রদান, মাঠপর্যায়ের তদারকি এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের গতি কমে যাচ্ছে।
শুধু উপজেলা পরিষদের দফতরগুলোতেই নয়, শিক্ষা খাতেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকট।
মতলব উত্তর উপজেলায় ১৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১৭টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এসব বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এছাড়া, উপজেলার ১১টি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এমনকি মতলব উত্তরের একমাত্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ছেংগারচর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়েও বর্তমানে প্রধান শিক্ষক নেই। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছেংগারচর সরকারি ডিগ্রি কলেজেও অধ্যক্ষের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান মতলব উত্তর থানাতেও রয়েছে জনবল সংকট। থানায় ওসি (তদন্ত) পদটি শূন্য থাকায় পুলিশের নিয়মিত তদন্ত কার্যক্রমেও অতিরিক্ত দায়িত্বের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একাধিক চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। এতে উপজেলার ৫ লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
এদিকে, ছেংগারচর পৌরসভায় ৯৩ শতাংশ শূন্য পদ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে উপজেলা পরিষদে এসে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পাওয়া যায় না। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার উপস্থিতির দিন না জানায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষকে একাধিকবার উপজেলা পরিষদে আসতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি কাজ সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থের অপচয় হয়। পাশাপাশি সরকারি সেবার প্রতি মানুষের আস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয়দের মতে, একজন কর্মকর্তা যখন নিজের দফতরের পাশাপাশি আরেকটি উপজেলার দায়িত্ব পালন করেন, তখন কোনো জায়গাতেই তিনি পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। এতে কাগজপত্র নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন সব ক্ষেত্রেই ধীরগতি তৈরি হয়।
মতলব উত্তর উপজেলার সচেতন নাগরিকদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরগুলোর শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষের শূন্য পদে স্থায়ীভাবে কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে।
তাদের মতে, শুধু অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে বছরের পর বছর একটি উপজেলা চালানো হলে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে হলে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দফতরে নিয়মিত ও পূর্ণকালীন কর্মকর্তা থাকা জরুরি।
১৬টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরে কর্মকর্তা সংকট, থানায় গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষের দীর্ঘদিনের শূন্যতা সব মিলিয়ে মতলব উত্তর উপজেলা যেন জনসেবা ও প্রশাসনিক সংকটের এক জটিল চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
উপজেলার সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি আব্দুল বাতেন বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকবিহীন এতগুলো বিদ্যালয় পরিচালনা করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদানসহ বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করছেন। এতে শিক্ষার পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। দ্রুত শূন্য পদগুলোতে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. ফারুকুল ইসলাম বলেন, ‘একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন না, তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা বিভাগের মধ্যে সমন্বয় করেন। দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকলে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রমে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব পড়ে। তাই দ্রুত শূন্য পদ পূরণ করা জরুরি।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকা বিদ্যালয়গুলোতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে, স্থায়ী প্রধান শিক্ষক থাকলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম আরও গতিশীলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় কিছুটা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করায় বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হলেও একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক থাকলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, অ্যাকাডেমিক তদারকি ও শিক্ষার মানোন্নয়ন আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ‘বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আপাতত দাফতরিক কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে, স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সেবা প্রদান ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে কিছুটা চাপ তৈরি হয়। শূন্য পদগুলোতে দ্রুত কর্মকর্তা পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। জনগণ যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই কাঙ্ক্ষিত সরকারি সেবা পান, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।’
সময়ের আলো/মহু