হরমুজ নিয়ে সমঝোতার ব্যপারে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করেছে তেহরান। একই সময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দাবি করেছে যে, তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার সিংহভাগই অক্ষত আছে। ইরানি নেতারা বলছেন, আমেরিকানরা বহু বিষয়ে ভুল হিসাব কষছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সত্ত্বেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার ৭৫ শতাংশের বেশি অক্ষত এবং এখনই ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা। বুধবার ইরানের সেনাবাহিনীর নির্বাহী উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি রেজা শেখ এ তথ্য জানান।
তার এই বক্তব্য ইরানের সামরিক সক্ষমতার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল্যায়নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে দেওয়া বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি রেজা শেখ বলেন, ওয়াশিংটন যেমন দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা ততটা সফল হয়নি।
শেখ বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার ৭৫ শতাংশের বেশি অক্ষত এবং ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের ড্রোন ব্যবস্থাকে তিনি ‘শত্রুর জন্য দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। হামলা সত্ত্বেও তেহরান এখনও নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারে সক্ষম, তা তুলে ধরতেই তিনি এ মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্য গত মাসে ট্রাম্পের দেওয়া মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত। সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের আগের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের মাত্র ২১ থেকে ২২ শতাংশ অবশিষ্ট রয়েছে।
হরমুজ নিয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি
পারস্য উপসাগরে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে প্রচেষ্টা নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তীব্র মতবিরোধে লিপ্ত হয়ে আছে বলে ইরানের এক ঊর্ধ্বতন সূত্র জানিয়েছে। রয়টার্সকে তিনি জানিয়েছেন, জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তি পুনর্বহাল ও এটি বাস্তবায়ন করার বিষয়ে একটি সময়সীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের নৌপথে নতুন করে জাহাজে হামলা এবং বুধবার ইরানের নেতাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়ার পর এই সংকট সমাধানের আশা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংঘাতজুড়ে ট্রাম্প একদিকে সংঘাত বাড়াবার হুমকি দিচ্ছেন, আবার পরক্ষণেই চুক্তি সন্নিকটে বলে দাবি করছেন।
জুন মাসে দুই পক্ষ ‘সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধের’ ঘোষণা দিয়ে অন্তর্বর্তী চুক্তি করেছিল। তবে দ্রুতই তা ভেস্তে যায়। ট্রাম্প ৭ জুলাই চুক্তিটি ‘বাতিল’ বলে ঘোষণা দেন এবং এর এক সপ্তাহ পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চুক্তিটি ‘স্থগিত’ করার ঘোষণা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চুক্তি অনুযায়ী কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার অঙ্গীকার রক্ষা করেনি ইরান। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে; যার মধ্যে রয়েছে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং বাজেয়াপ্ত ইরানি সম্পদ মুক্ত করা।
ইরানের সূত্রটি রয়টার্সকে বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হওয়া আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ফিরে আসা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। তিনি ইরানকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, ইরান কেবল মুখেই বড় কথা বলে, বাস্তবে কিছু করে না। পশ্চিম এশিয়ায় প্রভাবশালী অবস্থানে তারা আর নেই।
তবে জলপথটি ব্যবস্থাপনার জন্য ইরানের গঠন করা ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এখনও বন্ধ রয়েছে এবং ইরানের দেওয়া শর্ত না মানা পর্যন্ত এটি খোলা হবে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইরানও ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে থাকা মার্কিন লক্ষ্যস্থল ও অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
জুনের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, দুই পক্ষের সম্মতিতে মেয়াদ বাড়িয়ে ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তোলার একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো হবে। তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদুলু এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছিল, দুই পক্ষ ওই ৬০ দিনের মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানি সূত্রটি রয়টার্সের কাছে সে দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
তিনি বলেন, মেয়াদ বাড়ানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ ইরানের দিক থেকে কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদকাল আদৌ শুরুই হয়নি, তাই তা বাড়ানোর কিছু নেই। চুক্তি হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করে এবং তার কয়েক দিন পর বের হয়ে যায়। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথ এবং পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহ হতো।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যকরভাবে এই প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে, যা একপর্যায়ে সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে পৌঁছেছিল, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। উপসাগরে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার লোহিত সাগরে সন্দেহভাজন হুতি হামলা এবং ওমান সাগরে মার্কিন হামলার পৃথক দুটি ঘটনা ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, ওমান সাগরে মার্কিন নৌ-অবরোধ অমান্য করায় পানামার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে তাদের এমএইচ-৬০ হেলিকপ্টার থেকে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে নৌযানটির স্টিয়ারিং ব্যবস্থা বিকল করে দেওয়া হয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮৮ ডলার এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮৩ ডলারে ওঠানামা করছে।
ভুল হিসাব কষছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ব্যর্থতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে ‘ভুল হিসাব’ করে আসছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভুল করেছে ওয়াশিংটন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ আরও বড় ধরনের ভুল হিসেবের উদাহরণ। তিনি বলেন, ভুয়া খবরের চেয়েও ভয়ংকর হলো ভুয়া গোয়েন্দা তথ্য।
এদিকে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি জানিয়েছেন, দেশটি শিগগিরই ব্রিকস জোটের প্রতিষ্ঠিত বহুপক্ষীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যোগ দিতে যাচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হেম্মাতির এ বক্তব্য প্রকাশিত হয়। ভারতে ব্রিকসের অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে তিনি এ মন্তব্য করেন। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এনডিবির করপোরেট কমিউনিকেশন বিভাগ ইরানের যোগদানের তথ্যটি নিশ্চিত করেনি।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্যোগে ২০১৫ সালে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। অবকাঠামো উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এই ব্যাংকে পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসরসহ আরও কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতি যোগ দেয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা