সিউলের পার্শ্ববর্তী ইয়াংগু গ্রামে কৃষক লি সাং-হিউক তার ক্ষেত থেকে আলু তুলতে গিয়ে মাটি খুঁড়ে হতবাক হয়ে যান। সপ্তাহখানেক আগেও তিনি দেখেছিলেন মাটির নিচে সতেজ ছিল আলু। প্রায় তোলার মতো হয়ে গিয়েছিল। কদিন পর সে আলু তুলতে গিয়ে দেখেন, মাটির নিচেই সেগুলো সিদ্ধ হয়ে গলে যেতে শুরু করেছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলছিলেন, এ যেন ঠিক রান্না করা আলু! মাটিই যেন চুলা হয়ে গেছে। এমন প্রচণ্ড গরম যে পুরো ক্ষেতের আলুই নষ্ট হয়ে গেছে। ধরা গলায় তিনি বলেন, শুধু ক্ষেত নয়। সবকিছু এখন তাপে পুড়ছে। কী বলব ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।
দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, এ দৃশ্য কেবল এক গ্রামেই সীমাবদ্ধ নেই। পূর্ব এশিয়াজুড়ে এমন তাপপ্রবাহ চলছে। মহাদেশটির বুক চিরে যেন আগুনের নদী বইছে। তাপপ্রবাহের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে একের পর এক। কোথাও তাপমাত্রা পৌঁছেছে ইতিহাসের রেকর্ড পর্যায়ে। কোথাও তীব্র গরম দিনের নতুন নামকরণ করে বলা হচ্ছে ‘ভয়াবহ উষ্ণ দিন’। মানুষ, প্রাণী, ক্ষেতের ফসল সবই প্রাণপণে লড়াই করছে খরতাপের বিরুদ্ধে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংসান শহরে তাপমাত্রা বিরাজ করছে ৪২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। দেশটির আবহাওয়ার ইতিহাসে এত উত্তাপ কখনো দেখা যায়নি। এই দাবদাহে এরইমধ্যে প্রাণ গেছে অন্তত ৩১ জনের। মারা গেছে লাখ লাখ পশুপাখি ও মাছ। রাষ্ট্রপতি লি জে-মিয়ং নিজেই স্বীকার করেছেন, এমন তাপমাত্রা আমরা আগে কখনো দেখিনি। এটাই এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তীব্র তাপে পুড়ছে জাপানও। সেখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাওয়ায় সরকার নতুন শব্দ যোগ করেছে। তাদের ভাষায় বলা হচ্ছে ‘ভয়াবহ উষ্ণ দিন’। তাপমাত্রা এতই চরমে পৌঁছেছে যে টোকিওর চিড়িয়াখানায় তিনটি সিংহ প্রাণ হারিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস না থাকলে এমন তাপপ্রবাহ হাজার বছরে একবারও দেখা যেত না। প্রকৃতির নিয়মেও এমন উত্তাপ ছিল অসম্ভব।
হংকংয়েও হয়েছে শতাব্দীর রেকর্ড। ৩৬.৯ ডিগ্রি তাপমাত্রায় শহরটি যেন দগ্ধ হচ্ছে। চীনের সিনজিয়াংয়ে তাপমাত্রা উঠেছে ৫০ ডিগ্রিতে। উত্তর কোরিয়ার রাজধানীতে রাতেও তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির নিচে নামছে না। বিজ্ঞানী জুন-ই লি ব্যাখ্যা দেন, তিব্বত ও প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর চাপ, সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব মিলে যেন উত্তাপের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে প্রকৃতি। বিশ্ব সংস্থার হিসাব, এশিয়া এখন যত দ্রুত গরম হচ্ছে, তা আগের যুগের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি।
তাপমাত্রার প্রভাবে ক্ষেতে ক্ষেতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গুয়াংজুতে তরমুজচাষি হং কিয়াং-হির পাকা তরমুজ তিন রাতেই নষ্ট হয়ে গেছে । তিনি বলেন, তরমুজ পেকে গিয়েছিল। মিষ্টতাসহ সবকিছু ঠিকই ছিল। তিনদিনের মাঝেই সব শেষ। পঞ্চাশ বছর ধরে চাষ করছি কিন্তু এমন দেখিনি কখনো। কেউ হারিয়েছেন তিন মাস ধরে পরিচর্যা করা স্ট্রবেরি।
বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই উত্তাপ আর কমবে না। বরং বাড়তে থাকবে। তাপপ্রবাহের পর তাপপ্রবাহ, তার মাঝে বৃষ্টি এমন দিন আরও আসবে। তাই এখনই বায়ু দূষণ কমানোর বড় উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে বাঁচার কৌশলও খুঁজতে হবে। না পারলে আগামী দিনে মাটির ভেতরে আলু সিদ্ধ হওয়ার চেয়েও আরও ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে মানব সভ্যতা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা