ধ্বংসস্তূপের নিচে অগণিত মরদেহ, বোমা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকার রাস্তাটি একসময় পথচারী ও যানবাহনে মুখর থাকত। দুপাশে ছিল বাড়িঘর, অফিস ও দোকানপাট। এখন পুরো

2026-09-29T00:00:17+00:00
2026-09-29T00:00:17+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ধ্বংসস্তূপের নিচে অগণিত মরদেহ, বোমা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০০ এএম 
ধ্বংসস্তূপের উঁচু পাহাড় জমে আছে চারপাশে। সংগৃহীত ছবি
গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকার রাস্তাটি একসময় পথচারী ও যানবাহনে মুখর থাকত। দুপাশে ছিল বাড়িঘর, অফিস ও দোকানপাট। এখন পুরো এলাকা জনশূন্য। আর রাস্তাজুড়ে শুধু ধ্বংসস্তূপ। গুঁড়িয়ে দেওয়া দোকানপাট ও ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে রাস্তাজুড়ে। কোনো কোনো অংশে নর্দমার ময়লা পানি উপচে পড়ছে। পাশেই ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি বহুতল ভবন কাত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাস্তুচ্যুত কিছু পরিবার এখনও ভবনটির ভেতরে বসবাস করছে। 

তাল আল-হাওয়া এলাকার ওই রাস্তার কিছু অংশ পরিষ্কার করতেই পুরো দিন কেটে গেছে জাতিসংঘের প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ানের। গ্রীষ্মের চড়া উত্তাপে ক্লান্ত তিনি। এত খাটুনির পর আশপাশে তাকিয়ে দেখেন, কিছুই যেন পরিষ্কার করা হয়নি; ধ্বংসস্তূপের উঁচু পাহাড় জমে আছে চারপাশে। আলিয়ান বলেন, ‘মনে হচ্ছে আমরা যেন একটা চামচ হাতে নিয়ে পুরো সমুদ্র খালি করার চেষ্টা করছি।’

সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে গাজার ধ্বংসস্তূপের নানা তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে টানা তিন বছর ধরে ইসরাইলি বোমাবর্ষণ ও সামরিক অভিযানে গাজায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ জমা হয়েছে। ফিলিস্তিনে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বিশেষ প্রতিনিধি জাকো সিলিয়ার্স বলেন, ‘গাজায় মোট ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন। গত ১৮ বছরে বিশ্বজুড়ে সংঘটিত সব যুদ্ধে সৃষ্ট মোট ধ্বংসস্তূপের এটি প্রায় ২০ গুণ।’

জাতিসংঘের হিসাবে, গাজা উপত্যকার এই বিশাল ধ্বংসস্তূপের বড় একটি অংশ সরাতেই অন্তত ৭ থেকে ১০ বছর সময় লেগে যাবে। এতে ব্যয় হবে কোটি কোটি ডলার।

গাজার এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের অভিযানটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও জটিল অভিযানে পরিণত হতে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন সিলিয়ার্স। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে অগণিত মরদেহ ও অবিস্ফোরিত বোমা। এই বিপুল পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে গাজা পুনর্গঠন করা আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।

জাতিসংঘের তথ্য মতে, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে মাত্র ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো সম্ভব হয়েছে। ৩ লাখ টনের বেশি পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেল করা গেছে। তবে এটি মোট ধ্বংসস্তূপের মাত্র দেড় শতাংশ। একই সঙ্গে এ পর্যন্ত তারা ৫৮০ কিলোমিটার রাস্তা পরিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। এতে ত্রাণবাহী ট্রাক, উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াত কিছুটা হলেও সহজ হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরিস্থিতি বেশি জটিল করে তুলেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। খাদ্য বা ওষুধ নয়—এমন প্রায় প্রতিটি সাহায্য সামগ্রীই হামাসের হাতে যেতে পারে, এমন দোহাই দিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম গাজায় ঢুকতে বাধা দিচ্ছে তারা। শুরুর দিকে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (ডব্লিউএফপি) কাজ কেবল রাস্তা থেকে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে দুপাশে ঠেলে দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল, যেন ত্রাণবাহী ট্রাক চলাচলের পথ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ এতই বেশি যে তা সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। তার ওপর প্রায় এক বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলি বোমা হামলা অব্যাহত থাকায় এই কাজে নতুন নতুন বাধা সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান ডব্লিউএফপির কর্মীরা।

গার্ডিয়ান জানায়, গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরাইলের তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ দিন দিন গাজার ভেতরের দিকে ঢুকছে। ইসরাইলি সেনারা দিন দিন আরও ভূখণ্ড দখল করে নিচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমানে সাধারণ মানুষ ও ত্রাণকর্মীদের চলাচলের জন্য পুরো গাজা উপত্যকার মাত্র ৩০ শতাংশেরও কম এলাকা উন্মুক্ত রয়েছে। ফলে এই বিশাল ধ্বংসস্তূপ কোথায় রাখা হবে—সেই সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

ইউএনডিপির কর্মকর্তা সিলিয়ার্স বলেন, ‘আমরা এই সমস্যা সমাধানের জন্য ধ্বংসস্তূপগুলো বিভিন্ন উপায়ে রিসাইকেল বা প্রক্রিয়াজাত করে পুনরায় ব্যবহারের চেষ্টা করছি।’

তিনি আরও বলেন, পুরো গাজাজুড়ে পাঁচটি ক্রাশিং পয়েন্ট বা ধ্বংসস্তূপ গুঁড়া করার কেন্দ্র পরিচালনা করছে ইউএনডিপি। যেখানে রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো থেকে সংগৃহীত ধ্বংসাবশেষ প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। মাত্র সাতটি ক্রাশার মেশিন দিয়ে চলছে এই কার্যক্রম। নতুন কোনো যন্ত্রপাতি গাজায় ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরাইল।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ধ্বংসস্তূপ ও রাস্তায় পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত বোমা অপসারণ করা।

ইউএনডিপি ও ডব্লিউএফপি জানায়, গাজায় বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা সীমিত থাকায় অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয় বা তা সরাতে পারছেন না তারা। তবে জাতিসংঘের মাইন অপসারণকারী শাখা (ইউএনএমএএস), ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা ‘দ্য হ্যালো ট্রাস্ট’ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে অবিস্ফোরিত বোমার অবস্থান চিহ্নিত করে বিপজ্জনক এলাকায় সতর্কতামূলক চিহ্ন দিয়ে রাখছে ইউএনডিপি।

বিস্ফোরকের পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপে অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানও রয়েছে। যেমন—অ্যাসবেস্টস, যা বাতাসের সঙ্গে মিশে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোও বড় ঝুঁকি বলে জানায় ইউএনডিপি। অনেক পরিবার নিরাপদ ভেবে নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসে। কিন্তু পরক্ষণেই সেগুলো হঠাৎ ধসে পড়ে। তাই বাসিন্দারা ফিরে আসার আগে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা যাচাই করা এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


সিলিয়ার্স বলেন, ‘প্রাথমিক পুনরুদ্ধারের গতি খুবই ধীর। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সুযোগ-সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা।’

কিছু অংশের ধ্বংসস্তূপ সরানোর ইতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। তাল আল-হাওয়া এলাকায় বসবাসরত ইব্রাহিম দরদোনা গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘রাস্তাগুলো এখন কিছুটা প্রশস্ত হয়েছে, ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উপদ্রব কমেছে এবং গাড়ি চলাচলের পথ সহজ হয়েছে। এখানকার ধ্বংসস্তূপগুলো খেলতে আসা শিশুদের জন্যও বিপজ্জনক ছিল।’

গত প্রায় তিন বছর ধরে গাজায় ভয়াবহ মানবিক সংকট বিরাজ করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২১ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ এখন তাদের প্রতিদিনের জীবনের একটি অংশে পরিণত হয়েছে।

আবাসিক এলাকাগুলোতে যাতায়াত ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ সরানোর বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে জানান ডব্লিউএফপির সদস্য নিহাল আবু হাসান। তিনি বলেন, বাইরে থেকে দেখতে কেবল ইট-পাথরের স্তূপ মনে হলেও এর প্রতি মিটারের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে অনেক কিছু, যা আমরা জানি না।

আবু হাসান আরও বলেন, অনেক এলাকায় এই ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে মিশে আছে মানুষের পুরো জীবন ও তাদের স্মৃতি। এখনও চাপা পড়ে থাকতে পারে স্বজনদের মরদেহ। এ কারণেই এটি পরিবার ও স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়।

ইউএনডিপির তথ্য অনুযায়ী, এখনও প্রায় ৮-১০ হাজার মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে। এটি গাজার সবচেয়ে মানবিক ও হৃদয়বিদারক সংকটগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

ইউএনডিপি জানিয়েছে, তারা রেড ক্রসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। সম্ভাব্য মরদেহ চাপা পড়ে থাকা স্থানগুলো চিহ্নিত করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

ইউএনডিপির সিলিয়ার্স বলেন, ‘আমরা মরদেহ শনাক্তকরণের জন্য ফরেনসিক কার্যক্রম এবং ধর্মীয় রীতি মেনে তাদের সৎকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে মৃতদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সনদ দেওয়ারও চেষ্টা করছি।’

তিনি বলেন, সর্বস্ব হারানো গাজার অনেক মানুষের কাছে এই সনদই হয়তো তার প্রিয়জনের শেষ স্মৃতি।



সময়ের আলো/ইউএমএইচ


  বিষয়:   ধ্বংসস্তূপ  গাজা  ইসরায়েল 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: