তাইওয়ান-চীন একীভূতকরণের প্রচারে ‘হোয়াইট উলফ’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

তাইওয়ানের চীনা একীকরণপন্থী দল বিলুপ্ত করতে উদ্যোগ নিয়েছে তাইওয়ান। দলটির বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের দাবি

2026-08-14T08:37:33+00:00
2026-08-14T08:37:33+00:00
 
  শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬,
৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
তাইওয়ান-চীন একীভূতকরণের প্রচারে ‘হোয়াইট উলফ’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৩৭ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
তাইওয়ানের চীনা একীকরণপন্থী দল বিলুপ্ত করতে উদ্যোগ নিয়েছে তাইওয়ান। দলটির বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের দাবি করছে দেশটি। তবে চ্যাং আন-লো দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, তার লক্ষ্য শান্তি প্রতিষ্ঠা।

‘হোয়াইট উলফ’ নামে পরিচিত চ্যাং আন-লো চীনা একীকরণ প্রচার দলের (সিইউপিপি) প্রতিষ্ঠাতা। দলটি তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে ‘পুনরায় একীভূত’ করার পক্ষে প্রচার চালায়। তাইওয়ানে চ্যাংয়ের এই অবস্থান খুব একটা জনপ্রিয় নয়। সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে চীনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকলেও প্রায় এক শতাব্দী ধরে তাইওয়ান চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে পৃথকভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই দ্বীপটি প্রথমে জাপানের উপনিবেশ ছিল। পরে এটি ‘রিপাবলিক অব চায়না’ নামে পরিচালিত হয়। চীনা গৃহযুদ্ধের শেষে ১৯৪০-এর দশকে চিয়াং কাই-শেকের সরকার তাইওয়ানে চলে আসে।

বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ তাইওয়ানবাসী দ্বীপটির বর্তমান বাস্তবিক স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে। অন্যদিকে বেইজিংয়ের চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের একটি প্রদেশ হিসেবে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও একীভূত করার কথা বলে আসছে। চ্যাং তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই চিং-তে’র বিরুদ্ধে বেইজিংকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে লাই সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন।

চ্যাং বলেন, চীনের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাত হলে তাইওয়ানের জনগণকে ‘কামানের গোলার খাদ্য’ হতে হবে না। তিনি বলেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতার দাবি না তুললে যুদ্ধের সম্ভাবনাও থাকবে না। তার ভাষায়, ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতার পথে গেলে এবং সংঘাত উসকে দিলে আমরা সামনের সারিতে দাঁড়াব। আমরা কামানের গোলার খাদ্য হতে চাই না।’

চ্যাং আরও দাবি করেন, সম্ভাব্য সংঘাতের সময় বেসামরিক নাগরিকদের আশ্রয় দিতে তাইওয়ানের কিছু দাওবাদী মন্দির ব্যবহারের বিষয়ে তিনি চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
তবে তার সমালোচকদের মতে, চ্যাংয়ের অবস্থান শুধু আপত্তিকর নয়, এটি সম্ভাব্য রাষ্ট্রদ্রোহেরও শামিল।

তাইওয়ানের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী লাই চুং-চিয়াং বলেন, ‘সামনের সারিতে দাঁড়ান, কামানের গোলার খাদ্য হবেন না’— এই বক্তব্যের অর্থ শুধু চীনাদের প্রতিরোধ না করা নয়। এর মাধ্যমে তাইওয়ানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রতি আনুগত্য না দেখানোর কথাও বলা হচ্ছে।

তাইওয়ানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চ্যাংয়ের দল সিইউপিপিকে ‘রিপাবলিক অব চায়নার অস্তিত্ব এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

গত সপ্তাহে দলটি বিলুপ্ত করতে তাইওয়ানের সাংবিধানিক আদালতে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সরকারের অভিযোগ, দলটি বেইজিংয়ের নির্দেশনা নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে নিয়োগ করেছে এবং চীনা অর্থায়নে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে।

২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সিইউপিপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটির অন্তত ১১ সদস্যকে জাতীয় নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশবিরোধী আইন বা নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্ত বা বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে চ্যাং তার দলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তাইওয়ানের সাধারণ সমাজের তুলনায় তার দলের সদস্যদের অপরাধের হার কম। অপরাধে জড়িত কাউকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় বলেও জানান তিনি।

চীনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকারী ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের হয়ে তিনি কাজ করেন কি না— এমন প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও এর কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন চ্যাং।

তিনি বলেন, ‘তাইওয়ান প্রণালীর দুই পাশের মানুষের শান্তি ও সুখের জন্য আমি ঐক্যফ্রন্টের কর্মকাণ্ডকে পুরোপুরি সমর্থন করি।’

চ্যাং ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। তবে জাতীয় সংসদে সিইউপিপির কোনো প্রতিনিধি নেই। নিউ তাইপে সিটি ও মিয়াওলি কাউন্টিতে স্থানীয় পর্যায়ের মাত্র দুজন নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছেন দলটির।

রাজনীতির বাইরে অবশ্য স্থানীয় মানুষের জন্য নানা ধরনের সহায়তাও দেন চ্যাং। সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি প্রতারণা চক্রের আস্তানায় আটকে পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা এক তরুণীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন তিনি।

চ্যাংয়ের দাবি, এ ধরনের ঘটনায় পাচারের শিকার হওয়া কয়েক ডজন তাইওয়ানবাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তিনি সহায়তা করেছেন। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের সুদের কারবারিদের সঙ্গে দেনা-পাওনা পুনর্নির্ধারণেও সহায়তা করেন বলে জানান তিনি। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করতে পারেনি আল জাজিরা।

সিইউপিপির একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে তাইওয়ানের অন্যতম পরিচিত অপরাধী চক্র ‘বাম্বু ইউনিয়ন’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তদন্ত হয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে চীনা অভিবাসীদের সন্তানদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই অপরাধী সংগঠনের সঙ্গে নিজের অতীত সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন চ্যাং। তাঁর দাবি, ১৯৬৮ সালেই তিনি সংগঠনটি ছেড়ে দেন।

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে মাদক পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল কারাগারে ১০ বছর কাটান চ্যাং। মুক্তির পর তাইওয়ানে ফেরত পাঠানো হলে তিনি চীনে চলে যান। সেখানে তাইওয়ানের কর্তৃপক্ষের সংগঠিত অপরাধবিরোধী অভিযানের কারণে তিনি কিছু সময় অবস্থান করেন।

২০১৩ সালে তাইওয়ানে ফেরার পর বিমানবন্দরেই তাকে সংগঠিত অপরাধ প্রতিরোধ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয় প্রসিকিউশন।

এরপর নিজেকে চীনা জাতীয়তাবাদী হিসেবে নতুনভাবে তুলে ধরেন চ্যাং এবং সিইউপিপির প্রধান মুখে পরিণত হন।

তাইওয়ান সরকার দলটি বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার পর এর সমালোচনা করেছে চীন। বেইজিংয়ের দাবি, রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন করতেই তাইপে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

চীনের তাইওয়ানবিষয়ক কার্যালয়ের মুখপাত্র চেন বিনহুয়া বলেন, একীকরণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা বৈধ ও ন্যায্য। এটি চীনা জাতির সামগ্রিক স্বার্থ ও ইতিহাসের ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে তাইওয়ানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক পু-চাও হুং মনে করেন, সিইউপিপিকে বিলুপ্ত করা তাইপের জন্য মূলত প্রতীকী বিজয় হবে। কারণ দলটি বিলুপ্ত হলেও চীনের প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে না।

তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করলেই এর মানুষ, অর্থায়ন বা স্থানীয় নেটওয়ার্ক অদৃশ্য হয়ে যায় না।’

চীনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাইওয়ানে বিভিন্ন স্থানীয় নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে। ফলে সিইউপিপির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অন্য সংগঠন, নাগরিক গোষ্ঠী বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

চ্যাংয়ের মতে, চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের শান্তিপূর্ণ একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে হংকং একটি মডেল হতে পারে। ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে চীনের কাছে হস্তান্তরের আগে হংকংয়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের সঙ্গে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রসঙ্গও তিনি তুলে ধরেন।

চ্যাং বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, সামনে এগোনোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো আলোচনায় বসা।’ তার দাবি, ১৯৭৮ সাল থেকেই চীন একীকরণের জন্য অনুকূল কিছু শর্তের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। তার ভাষায়, দুই পক্ষ আলোচনায় বসলে জাতীয় সংগীত, পতাকা ও নাম—সবকিছু নিয়েই আলোচনা করা সম্ভব।

রিপাবলিক অব চায়না বা পিপলস রিপাবলিক অব চায়না—যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তাইওয়ান ও চীন একই দেশ বলে মনে করেন চ্যাং।

তিনি বলেন, ‘দুই পক্ষই চীনের প্রতিনিধিত্ব করে এবং আমরা সবাই চীনা।’

সময়ের আলো/কেএইচ


  বিষয়:   সময়ের আলো  তাইওয়ান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: