চলছে বর্ষা মৌসুম। নদী, খাল ও বিল পানিতে থৈ থৈ করছে। বৈশাখ মাস থেকেই টানা বৃষ্টির কারণে শিবচরের বিভিন্ন জলাশয়ে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পানি বাড়লেও জেলের জালে আর আগের মতো মিলছে না দেশীয় প্রজাতির মাছ। নিষিদ্ধ রিং, চায়না দুয়ারি এবং কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারের ফলে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে দেশীয় মাছের মজুত। একই সঙ্গে এসব জালে ব্যাঙ ও পোকামাকড়সহ নানা জলজ প্রাণী আটকা পড়ায় হুমকির মুখে পড়েছে পুরো জলজ জীববৈচিত্র্য।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বিভিন্ন নদী, খাল ও বিলে এসব নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার হরহামেশা দেখা গেলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ১৯৫০ সালের মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ‘চায়না দুয়ারি’ জাল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অমান্য করে বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে এসব জাল বিক্রি ও ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ করে, তবে নিয়মিত নজরদারির অভাবে এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন নদী, খাল ও বিলের অগভীর অংশে অর্ধেক পানিতে ডুবিয়ে এবং বাকি অংশ ডাঙায় রেখে চায়না দুয়ারি জাল পেতে মাছ শিকার করা হচ্ছে। অনেক স্থানে দিনের পর দিন এসব জাল পানিতে পেতে রাখা হয়। এর ফলে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট পোনা, ডিমওয়ালা মা-মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীও নির্বিচারে আটকা পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অতীতে বর্ষার নতুন পানি আসার পর নদী, খাল ও বিলে শোল, গজার, টেংরা, পাবদা, কৈ, বোয়াল, আইড়, মাগুর, শিং, পুঁটি, বাইম, চিংড়ি ও বাইলাসহ প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসব মাছের অনেক প্রজাতিই বিলুপ্তির পথে। বাজারেও দেশীয় মাছের সেই প্রাচুর্য আর নেই।
চায়না দুয়ারি জাল সাধারণত ৩০ থেকে ৮০ ফুট লম্বা এবং প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ৫ ফুট উঁচু হয়ে থাকে। লোহার রিংয়ের কাঠামোর চারপাশে অতি সূক্ষ্ম জালের ফাঁদ তৈরি করা হয়। আকার ও মানভেদে এসব জালের দাম ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলের ভাষ্য, চায়না দুয়ারি জাল পানিতে পেতে দীর্ঘ সময় ধরে মাছ শিকার করা যায়। এর দামও তুলনামূলক কম এবং বাজারে সহজে পাওয়ায় অনেকেই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এটি ব্যবহার করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা কাউসার আহম্মেদ বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য কার্যালয় থাকলেও নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি চোখে পড়ে না। নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়ালে এসব জালের ব্যবহার অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব।
পাঁচ্চরের মাছ ব্যবসায়ী সুমন হাওলাদার বলেন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ না হলে স্থানীয় জলাশয়গুলো মাছশূন্য হয়ে পড়বে। এসব জালে শুধু মাছ নয়, মারা পড়ছে বিভিন্ন জলজ প্রাণীও। এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, নিষিদ্ধ জালের দৌরাত্ম্যের কারণে বাজারে দেশীয় মাছ পাওয়া যায় না বললেই চলে। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে দেশীয় অনেক প্রজাতির মাছ চিরতরে হারিয়ে যাবে।
শিবচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, দেশীয় প্রজাতির মাছ সুরক্ষায় সারা বছরই চায়না দুয়ারি জালসহ অন্যান্য নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতনতামূলক কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
শিবচর উপজেলার ড. নুরুল আমিন ডিগ্রি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রভাষক রাজু আহমেদ বলেন, নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি, রিং ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের জন্য বড় ধরনের পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে। এর ফলে প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং জলজ জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে। দেশীয় মাছ ও জলজ সম্পদ রক্ষায় প্রজনন মৌসুমে কার্যকর সংরক্ষণ, অভয়াশ্রম বৃদ্ধি এবং নদী, খাল ও বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও যোগ করেন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায় দেশীয় অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়বে এবং জলজ পরিবেশ অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
সময়ের আলো/জোই