সিন্ধু নদের পানি নিয়ে ভারতকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি বলেছেন, সিন্ধু নদের পানির প্রতিটি ফোঁটাই পাকিস্তানের জন্য ‘রেড লাইন’। শান্তি চাইলেও দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষার ওপর কোনও হুমকি এলে ২০২৫ সালের মে মাসের চেয়েও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, পাকিস্তানের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানী ইসলামাবাদে ‘ইয়াদগার-ই-ফাতাহ’ স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শাহবাজ এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের শান্তি চাওয়াকে কোনোভাবেই দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। পাকিস্তান যুদ্ধ নয়, শান্তি চায়। তবে শান্তি চাওয়াকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তিনি বলেন, মর্যাদা ও দৃঢ়তার সঙ্গে আমরা শান্তির পক্ষে অটল। আঞ্চলিক শান্তি নিশ্চিত করতে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষার ওপর কোনও চ্যালেঞ্জ এলে তার জবাব আরও কঠোর হবে।
তিনি বলেন, কেউ যদি পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করে, তাহলে ২০২৫ সালের মে মাসের চেয়েও কঠোর জবাব দেয়া হবে।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের দিকে ইঙ্গিত করে এ কথা বলেন তিনি। সিন্ধু পানি চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করায় ভারতের সমালোচনাও করেন শেহবাজ।
তিনি বলেন, মে মাসে ‘পরাজয়ের’ পর ভারত এই পদক্ষেপ নিয়েছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, আমি সতর্ক করে দিচ্ছি, পানির প্রতিটি ফোঁটাই আমাদের রেড লাইন। ভারত যদি সঠিক পথে না থাকে, তাহলে আমরা সরাসরি জবাব দেব।
এর আগে, নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগভিত্তিক স্থায়ী সালিশি আদালত ২০২৫ সালের জুনে জানিয়েছিল, কয়েক দশকের পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তিতে একতরফাভাবে তা ‘স্থগিত’ বা ‘অকার্যকর’ করার কোনও সুযোগ নেই। চুক্তির আওতায় বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আদালতের এখতিয়ারও রয়েছে।
সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি নদীর পানি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিল এই চুক্তি। এর আওতায় পূর্বাঞ্চলের তিন নদী অর্থাৎ সতলজ, বিয়াস ও রাভি ভারতের জন্য বরাদ্দ। আর পশ্চিমাঞ্চলের তিন নদী— সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পাকিস্তানের দাবি, ভারত যেসব জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে, সেগুলোর কারণে নদীগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যেতে পারে। এসব নদীর পানির ওপর পাকিস্তানের সেচনির্ভর কৃষির প্রায় ৮০ শতাংশ নির্ভরশীল।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার পর ভারত চুক্তিতে অংশগ্রহণ স্থগিত করলে সিন্ধু পানি চুক্তি নতুন করে সংকটে পড়ে। প্রমাণ ছাড়াই ওই হামলার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে পাকিস্তানকে দায়ী করে নয়াদিল্লি। তবে ইসলামাবাদ অভিযোগ অস্বীকার করে এবং ঘটনার স্বাধীন তদন্ত দাবি করে।
এরপর দুই দেশ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাত্রা কমিয়ে আনে, প্রধান স্থলসীমান্ত বন্ধ করে দেয় এবং একে অপরের নাগরিকদের ভিসা বাতিল করে। ওই হামলার জন্য ইসলামাবাদ স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানালেও তা প্রত্যাখ্যান করে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে এবং পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়।
এর জবাবে পাকিস্তানও ভারতে হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দেয়। মে মাসের সেই সংঘাতে ভারতীয় কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পাশাপাশি দেশটির কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় পাকিস্তান। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন।
প্রথমে ভারত তার কোনও বিমান ভূপাতিত হওয়ার কথা অস্বীকার করলেও পরে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে। একইভাবে সে সময় কোনও সেনা নিহত হওয়ার কথাও অস্বীকার করেছিল ভারত। তবে সম্প্রতি দেশটি অন্তত ছয় সেনা নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে।
যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, সংঘাতে প্রায় ১১টি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত হয়েছিল।
পাকিস্তানের দাবি, তারা রাফাল যুদ্ধবিমানসহ ভারতের সাত বা আটটি বিমান ভূপাতিত করেছে।
এরপর থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে। ভারত দাবি করে, যুদ্ধবিরতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও ভূমিকা ছিল না। তবে পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগের প্রশংসা করেছে এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ