ভারতের মধ্যপ্রদেশের ডিন্ডোরি-মাণ্ডলা সড়কের পাশের শালবনে সম্প্রতি গাছ কাটার পাশাপাশি শাল কাঠভেদী পোকা ধরার অভিযান চলছে। বন বিভাগ বলছে, শালগাছ রক্ষায় আক্রান্ত গাছ সরিয়ে ফেলা এবং পূর্ণবয়স্ক পোকা ধরে বংশবিস্তার ঠেকানো— দুই কার্যক্রমই একসঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।
গ্রামবাসীরা কাটা ও বাকল ছাড়ানো গাছ থেকে শাল হার্টউড বোরার বা শাল কাঠভেদী পোকা সংগ্রহ করছেন। প্রতিটি পোকার জন্য তাদের দেওয়া হচ্ছে ২ রুপি। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১৯ লাখ ২৫ হাজার ১১৮টি পোকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে বন বিভাগের ব্যয় হয়েছে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার রুপি।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হপ্লোসেরামবিক্স স্পিনিকর্নিস নামে পরিচিত এই পোকাকে শালগাছের জন্য হুমকি হিসেবে প্রথম নথিভুক্ত করা হয় ১৮৯৭ সালে। সাম্প্রতিক সময়ে পোকার ব্যাপক সংক্রমণের কারণে মধ্যপ্রদেশে বড় পরিসরে শালগাছ কাটার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে মোদি সরকার সংক্রমিত ১ লাখ ৪৭ হাজার শালগাছ কাটার অনুমোদন দিয়েছে।
শাল বা শোরিয়া রোবাস্টা মধ্য ভারতের শুষ্ক পাতাঝরা বনাঞ্চলের অন্যতম প্রধান বৃক্ষপ্রজাতি। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওডিশা, ঝাড়খণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের কিছু অংশের বনভূমির বড় একটি অংশ এই গাছকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। কানহা ও পেঞ্চের মতো বাঘের অভয়ারণ্যেও শালগাছের বিস্তৃত উপস্থিতি রয়েছে।
শালকাঠ শক্ত ও সহজে পচে না বলে নির্মাণকাজ এবং রেললাইনের কাঠের পাটাতন তৈরিতে ঐতিহাসিকভাবে এটি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি শালের বীজ থেকে তেল তৈরি হয়, যা রান্না, সাবান ও মিষ্টান্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়। শালের পাতা দিয়ে থালা-বাটি এবং কাণ্ড থেকে রজন সংগ্রহ করা হয়। মধ্য ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছেও শালবনের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পোকাটি সাধারণত দুর্বল ও কম সবল গাছে বেশি আক্রমণ করে। তবে ২০ সেন্টিমিটারের বেশি পরিধির বিভিন্ন বয়সী শালগাছও এতে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে। ৯১ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার পরিধির গাছে মৃত্যুর ঘটনা বেশি দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি নথিভুক্ত হয়েছে ১২১ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার পরিধির গাছে। এসব গাছই শালবনের পরিণত ও ছাউনিবিশিষ্ট গাছ হওয়ায় বনটির কাঠামো ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভারতে এখন পর্যন্ত শাল কাঠভেদী পোকার ২১টির বেশি ব্যাপক সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রদেশ ও পার্শ্ববর্তী ছত্তিশগড়ে বড় ধরনের সংক্রমণ হয়েছিল। ওই সময় ১৬ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর শালবনের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু মাণ্ডলা জেলাতেই প্রায় ৮ লাখ গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ডিন্ডোরির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অশোক সোলাঙ্কি বলেন, তারা বিপুলসংখ্যক আক্রান্ত গাছ নিয়ে কাজ করছেন। পোকা ধরা ও গাছ কাটার কার্যক্রম আলাদা হলেও একই সময়ে পরিচালিত হচ্ছে।
বন বিভাগের তথাকথিত ‘ফাঁদগাছ’ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কিছু গাছ কেটে বাকল ছাড়িয়ে রাখা হয়। উদ্দেশ্য হলো পূর্ণবয়স্ক পোকাগুলো ডিম পাড়ার ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ পাওয়ার আগেই সেগুলো ধরে ফেলা। কাটা গাছ তিন দিন রেখে দেওয়া হয়। এ সময় পোকাগুলো গাছের কাণ্ডের বাইরে বেরিয়ে এলে ভোরে গ্রামবাসাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয় গ্রামবাসীরাই একটি সংস্থার মাধ্যমে এই কাজ করছেন। পুরো কার্যক্রম শেষ হতে প্রায় চার মাস সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাটা গাছের কাঠীরা সেগুলো হাতে ধরে সংগ্রহ করেন।
ডিন্ডোরির বন বিভাগের উপবিভাগীয় কর্মকর্তা সুরেন্দ্র যাদব জানান, বৃষ্টি শুরু হলে পোকা ধরার কার্যক্রম শুরু করা হয়। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৬টার দিকে পোকাগুলো গাছের বাইরে বেরিয়ে আসে। তখন সেগুলো ব্যাগে সংগ্রহ করা হয়।
অন্যদিকে আক্রান্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয় গ্রামবাসীরাই একটি সংস্থার মাধ্যমে এই কাজ করছেন। পুরো কার্যক্রম শেষ হতে প্রায় চার মাস সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাটা গাছের কাঠ পরে কাঠের বাজারে পাঠানো হবে।
সুরেন্দ্র যাদবের মতে, এবারের সংক্রমণের মাত্রা অস্বাভাবিক হলেও একেবারে নজিরবিহীন নয়। এটি প্রায় ৩০ বছর পরপর ফিরে আসা একটিক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে আবহাওয়াকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, গত বছর ডিন্ডোরি-মাণ্ডলা অঞ্চলে অস্বাভাবিক বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় পো নিশ্চিত হলে পাশের গাছে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সেটি সরিয়ে ফেলা জরুরি। তবে বিপুলসংখ্যক গাছ আক্রান্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সারা বছর প্রতিরোধমূলকভাবে পোকা ধরার কার্যক্রম চালানোর পরামর্শ চক্র। গত বছর সংক্রমণের মাত্রা কম থাকলেও এ বছর তা অনেক বেড়েছে।
জবলপুরের রাজ্য বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা উদয় হোমকারও সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে আবহাওয়াকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, গত বছর ডিন্ডোরি-মাণ্ডলা অঞ্চলে অস্বাভাবিক বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় পোকার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
হোমকার বলেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত শনাক্তকরণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গাছ আক্রান্ত হিসেবে নিশ্চিত হলে পাশের গাছে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সেটি সরিয়ে ফেলা জরুরি। তবে বিপুলসংখ্যক গাছ আক্রান্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সারা বছর প্রতিরোধমূলকভাবে পোকা ধরার কার্যক্রম চালানোর পরামর্শ দেন তিনি।
গাছ কাটা ও পোকা ধরার পাশাপাশি শাল কাঠভেদী পোকার প্রাকৃতিক শত্রু ব্যবহার করে জৈবিক নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাও নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে বড় পরিসরে এসব প্রাকৃতিক শত্রু লালন-পালন ও বনে ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এখনও পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ