চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প (শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড) যেন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। অর্ধশতাধিক শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিকের নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই। প্রশাসন-পরিবেশ অধিদফতরের নানা বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে প্রতি বছর কাটা হয় বড় বড় স্ক্র্যাপ জাহাজ। এতে প্রতি বছরই ৮-১০ জনের মৃত্যু হয়। বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ হিসেবে সেফটি রুলস উপেক্ষাকে দায়ী করা হচ্ছে। শুক্রবার ভোরে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসের বিষক্রিয়ায় অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়। বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। শিপইয়ার্ডের আশপাশের জেলেরা সমুদ্র থেকে মাছ নিয়ে ঘাটে ভিড়তে পারেনি। ঘটনাস্থল থেকে আধা মাইল দূরেও তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১৩ বছরে সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোতে ১৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বেশিরভাগই জাহাজভাঙা শ্রমিক। অর্থাৎ তারা জাহাজভাঙার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ৯ জন, ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৭ জন, ২০১৭ সালে ১৫ জন, ২০১৮ সালে ২০ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০২০ সালে ১১ জন, ২০২১ সালে ১৪ জন, ২০২২ সালে ১০ জন, ২০২৩ সালে ৫ জন, ২০২৪ সালে ৭ জন, ২০২৫ সালে ৩ জন, ২০২৬ সালের সাড়ে সাত মাসে ১২ জন ছিল। সর্বাধিক ২২ জনের মৃত্যু হয় ২০১৯ সালে। চলতি বছরের মধ্যে সাত মাসে ১২ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে শুক্রবার এক দিনেই মৃত্যু হয় ৯ জনের।
দুর্ঘটনায় হতাহত বেশিরভাগ শ্রমিক দরিদ্র। এসব শ্রমিকের মৃত্যুর পর তোড়জোড় শুরু হয়। শোরগোল পড়ে যায় প্রশাসন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এরপর আবার ইয়ার্ডগুলো স্বরূপে ফিরে আসে। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কাটা শুরু হয় স্ক্র্যাপ জাহাজ। কঠোর প্রশাসনিক তৎপরতা না থাকায় মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা এড়ানো যায় না বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডে জাহাজ কাটা এবং শ্রমিকদের অবস্থা নিয়মিত মনিটর করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসা। সংস্থার অ্যাডভোকেসি অফিসার মোহাম্মদ আলী শাহিন সময়ের আলোকে বলেন, জাহাজ কাটায় কোনো নিয়ম মানা হয় না। শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে এখন অধিকাংশ মালিক কর্তৃপক্ষ উদাসীন। গ্রিন সার্টিফিকেট শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড শতভাগ নিরাপদ তা নিশ্চয়তা দেয় না।
তিনি বলেন, শুক্রবার একটি গ্রিন ইয়ার্ডে সপ্তাহের ছুটির দিনে দুর্ঘটনায় ৯ জন শ্রমিক নিহত হয়। এই মৃত্যুর মাধ্যমে নিরাপত্তা অবহেলার বিষয়টি প্রমাণ করেছে। সেফটি নিশ্চিত করার জন্য তাড়াহুড়া না করে সব নিয়মনীতি মেনে শিপ রিসাইক্লিং করতে হবে।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে এই ধরনের হতাহতের ঘটনা কেন ঘটবে? এই পর্যায়ে এসে কেন এই ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটবে। মূলত মালিক কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকির অভাব, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও তা চর্চার অভাব রয়েছে। দ্রুত জাহাজভাঙা নিশ্চিত করার মনোভাব এই জাতীয় দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিবেশ এবং বিস্ফোরক অধিদফতর সূত্র জানায়, প্রতিটি শিপইয়ার্ডকে নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিয়েই লাইসেন্স নিতে হয়। এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত তদারকি করার নিয়ম আছে। বর্তমানে গ্রিন শিপ ইয়ার্ডের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে নিরাপদ জাহাজ কাটা বা ভাঙা নিশ্চিত করতে। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম মানার ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি আছে। তাই বারবার শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনা ঘটছে। মারা পড়ছে দরিদ্র নিরীহ শ্রমিক।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাটিজের (বিআইএলএস) দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, বারবার দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে। দুর্ঘটনার জন্য নানা কারণ সামনে এসেছে। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনার পেছনে পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত শ্রমিকদের স্থায়ীভাবে চাকরি না পাওয়া, এক ঘণ্টা পরপর ১৫ মিনিটের বিশ্রাম না দেওয়া, নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে শ্রমিকদের লোভ দেখিয়ে জাহাজ কাটতে বাধ্য করা, ইয়ার্ডগুলোতে যোগ্য সেফটি অফিসার না রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শদাতা নিয়োগ না দেওয়া।
তিনি বলেন, মালিকপক্ষের সাময়িক লাভের মানসিকতা এ ধরনের দুর্ঘটনার বড় কারণ। বর্তমানে চারটি ইয়ার্ড গ্রিন সার্টিফায়েড হয়েছে। নতুন বছরে আরও বেশ কয়েকটি ইয়ার্ড গ্রিন সার্টিফায়েড হওয়ার কথা রয়েছে। অবকাঠামোগত কমপ্লায়েন্স মেইনটেইন করার পাশাপাশি তারা যদি সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স মেইনটেইন করার কথা ভাবে তা হলে দুর্ঘটনা কমে যাবে।
গ্রিন শিপইয়ার্ড কী
নিরাপত্তা বাড়িয়ে মৃত্যু দুর্ঘটনা কমাতেই মূলত গ্রিন শিপইয়ার্ডের বাধ্যবাধকতা। দেশের শিপইয়ার্ডগুলোকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের নির্দেশনা দেয় হংকং কনভেনশন। শিপইয়ার্ডগুলোকে দ্রুত গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরিত না করলে বাংলাদেশে স্ক্র্যাপ জাহাজ পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানায় বিদেশি বিক্রেতারা।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যেসব দেশ স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করবে তাদের ইয়ার্ডগুলোকে গ্রিন ইয়ার্ড বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু দেশের শিপইয়ার্ড আধুনিকায়নে আর্থিক ব্যয় নিয়ে বড় সংকট আছেন উদ্যোক্তারা। এ কারণে গ্রিন শিপইয়ার্ড বাস্তবায়ন হচ্ছে ধীরগতিতে। তাদের মতে সরকারি প্রণোদনা ছাড়া সবার পক্ষে গ্রিন ইয়ার্ড বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
দেশে প্রায় ১৫০টি শিপইয়ার্ড নিবন্ধিত আছে। তবে মাত্র ৪০টির মতো শিপইয়ার্ড তাদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস ২০১১, আন্তর্জাতিক আইন এবং ২০০৯ সালের চীনে অনুষ্ঠিত হংকং কনভেশন রুলস অনুযায়ী আমূল ঢেলে সাজানো হচ্ছে এ শিপইয়ার্ডগুলো।
আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সব শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড হংকং কনভেনশন সার্টিফিকেশন রুলস অনুযায়ী গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সবশেষ তথ্যানুযায়ী এখন পর্যন্ত ৮৫টি প্রতিষ্ঠান গ্রিন ইয়ার্ড বাস্তবায়নে শিপ রিসাইক্লিং ফ্যাসিলিটি প্ল্যান (এসআরএফপি) শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। তবে গ্রিন শিপইয়ার্ডে নিয়মিত হচ্ছে দুর্ঘটনা। এতে গ্রিন ইয়ার্ড করার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও