বাণিজ্যিক নদীবন্দর হিসেবে একসময় দ্বিতীয় কলকাতা খ্যাতি অর্জন করেছিল প্রাচীনতম শতবর্ষী শহর ঝালকাঠি, যার মূল কারণ ছিল লবণ শিল্প। কিন্তু একের পর এক লবণ কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে এ শিল্পটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। লবণ শিল্পের প্রসারের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির পরিচিতি ছিল দেশের গন্ডি পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। আধুনিক প্রযুক্তিতে লবণ উৎপাদনকারী অন্য কোম্পানিগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে না পারায় সেই পরিচিতিতে ভাটা পড়েছে।
তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এখনও ঝালকাঠির লবণের মিলগুলো থেকে উৎপাদন হয় বছরে ২০০ কোটি টাকার লবণ। বাজারের বড় বড় কোম্পানির লবণ যেখানে খুচরা প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৩৫-৪০ টাকায় সেখানে ঝালকাঠির লবণ বিক্রি হয় ২০-২২ টাকায়। দাম কম হওয়ায় এখানের লবণ পাশর্^বর্তী এলাকায় সরবরাহ করা হয় এবং রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া থেকে পাইকাররা এসে নিয়ে যান।
ঝালকাঠির বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক আল আমিন বলেন, আমরা সার্বক্ষণিক লবণ শিল্পের মান ধরে রাখতে সব ধরনের সহায়তা করে আসছি। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এবং আধুনিকায়ন করার জন্য বিসিক সবসময়ই পাশে আছে এবং বিসিক সেটা করে থাকে।
জেলা লবণ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জামাল শরীফ বলেন, আধুনিক কোম্পানিগুলোর (অটোমিল) সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লবণ উৎপাদনে টিকে থাকতে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এটা করা গেলে দেশীয় লবণ শিল্পের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব। পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো করার চিন্তা করছে মালিক সমিতি। পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ, মূলধন এবং সরকারি সার্বিক সহযোগিতা পেলে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি বন্ধ করে আবারও দেশীয় লবণ শিল্পের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
নদীপথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ব্রিটিশ আমল থেকে বাসন্ডা নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠে ১৭টি লবণ কারখানা। সেই সময় থেকে এই বাসন্ডা নদীর তীরে দেখা যেত বড় বড় সাম্পান নৌকা আর ট্রলার, যা এখন আর চোখে পড়ে না। একটা সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র হওয়ায় এই জেলাকে বলা হতো দ্বিতীয় কলকাতা। আবার লবণ শিল্পের প্রসার এবং ঐতিহ্যের কারণেই খ্যাতি অর্জন করেছিল ঝালকাঠি বন্দরের মর্যাদা।
এখানে লবণ সনাতনী পদ্ধতিতে প্রস্তুত করার মাধ্যমে উৎপাদন হয়। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম থেকে লবণের কাঁচামাল এনে শোধন করে শুরু হয় সনাতনী পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন। বেশ কয়েক ধাপে পানিমিশ্রিত লবণের দানাগুলো রাসিন মেশিনে শুকিয়ে ঝরঝরা করা হয়। তৈরি হয় বিভিন্ন শিল্পের ব্যবহার উপযোগী লবণ। পরে পরিমাণ মতো আয়োডিন মিশিয়ে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করা হয়। আশির দশকে লবণ উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হলে পিছিয়ে পড়ে ঝালকাঠির লবণ শিল্প।
ঝালকাঠিতে ১৭টি লবণ কারখানার মধ্যে মিতালী সল্ট, নুর সল্ট, সুরভি সল্টসহ ১০টি লবণ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে শরীফ সল্ট, নিউ ঝালকাঠি সল্টসহ টিকে আছে সাতটি লবণ মিল। আধুনিক কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা কঠিন হলেও এখানকার লবণ উৎপাদন আগের চেয়েও দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে