বাবা প্রদীপ জলদাসকে হারিয়েছিলেন ১১ বছর আগে। এরপর গার্মেন্টসে চাকরি করে দুই ছেলেকে বড় করেছিলেন মা আশোকী জলদাস। বড় ছেলে চন্দনও চাকরি করেন, আর ছোট ছেলে সানি জলদাস মাত্র ২০ বছর বয়সে কাজ শুরু করেছিলেন জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, একদিন সানি তাদের কষ্টের দিন বদলাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি, জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ গেছে সানির।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে বিষক্রিয়ায় নয় শ্রমিক নিহত হন। তাদেরই একজন সানি জলদাস।
সানির বাড়ি সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী মির্জানগর জেলেপাড়ায়। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি ওই জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে কাজ করতেন।
পরিবারের খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাদের কোনো স্থায়ী বসতভিটা নেই। একসময় সাগরে মাছ ধরে জীবিকা চলত। সানির বাবা প্রদীপ জলদাস অসুস্থ হয়ে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি। একপর্যায়ে ১১ বছর আগে তিনি মারা যান। তখন সানি ও তাঁর বড় ভাই চন্দন ছোট ছিলেন। স্বামীকে হারানোর পর মা আশোকী জলদাস গার্মেন্টসে চাকরি নিয়ে দুই ছেলেকে বড় করেন। সংসারের হাল ধরতে ছোট ছেলে সানি যোগ দিয়েছিলেন জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে।
নিহত সানির নানা সুবল দাস বলেন, ২০ বছরের নাতি এভাবে অকালে চলে যাবে, কখনো ভাবিনি। ওদের সংসারে এমনিতেই অনেক কষ্ট। বাবা নেই, মা অনেক কষ্ট করে দুই ছেলেকে বড় করেছে।
এদিকে সানির বড় ভাই চন্দন জানান, সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামলাসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁদের থানায় ডেকেছেন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করতে তারা রাজি নন।
অন্যদিকে সানির এক স্বজন অভিযোগ করে বলেন, দুর্ঘটনার পর সানি ইয়ার্ডের গেটের সামনে চলে এসেছিলেন, কিন্তু তাকে দ্রুত বের হতে দেওয়া হয়নি। দ্রুত অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতো বলে দাবি করেন তিনি। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই এতগুলো তরতাজা প্রাণ ঝরে গেছে বলে অভিযোগ তাদের।
মাত্র ২০ বছর বয়সেই সানির জীবন থেমে গেল। যে মা স্বামীকে হারিয়ে বছরের পর বছর গার্মেন্টসে কাজ করে ছেলেদের বড় করেছেন, সেই মায়ের কাঁধেই এখন সন্তানের লাশের শোক। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট দূর করার স্বপ্ন দেখা সানি নিজেই এখন রেখে গেছেন গভীর শূন্যতা।
সময়ের আলো/আতা