বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতীয় সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, আগামী ২১ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে সফরটি হতে পারে। তবে সফরের তারিখ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।
ভারতের আরেক গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও সেখান থেকে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই তারেক রহমানের সফর নিয়ে আলোচনা চলছে। দুই দেশের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর হতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এর আগে তাকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের বিশেষ অধিবেশনে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে অংশ নেওয়ার জন্যও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
৫ আগস্টের বক্তব্যে নতুন করে অস্বস্তি
দুই দেশের সম্পর্কে সাম্প্রতিক উত্তেজনার বড় কারণ হয়ে উঠেছে শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের বক্তব্য। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে সরকারের পতনের দুই বছর পূর্তির দিন ভারতের একটি অজ্ঞাত স্থান থেকে অনলাইনে বক্তব্য দেন তিনি। ওই বক্তব্যে ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথাও জানান।
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের আদালতে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। ফলে ভারত থেকে তার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি ঢাকার কাছে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
দিল্লির বক্তব্য, ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং শেখ হাসিনার বক্তব্যকে তারা সমর্থনও করেনি।
সফর নিয়ে আগেও হয়েছে আলোচনা
তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। জুনের শুরুতে এ নিয়ে আলোচনা হলেও পরে সফরটি আর এগোয়নি। জুলাইয়ে আগস্টের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়েও কথা হয়।
ভারতীয় পক্ষ ২১ আগস্টকে সম্ভাব্য সফরের তারিখ হিসেবে প্রস্তাব করে। কিন্তু একই সময়ে শেখ হাসিনার দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর ঢাকা সফর নিয়ে আলোচনা স্থগিত করে বিষয়টি ভারত সরকারের কাছে তোলে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। ভারতীয় পক্ষের ব্যাখ্যা ছিল, অনুষ্ঠানটি দিল্লিতে অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল।
হাসিনাকে ফেরত চায় ঢাকা
তারেক রহমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রথম সরাসরি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দিল্লির অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে স্পষ্ট এবং যুক্তিসংগত উত্তর না পেলে তারেক রহমানের ভারত সফর কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংয়ের (র) প্রধান পরাগ জৈন সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি দেশটির শীর্ষ গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় হাসিনা ইস্যুতে ঢাকার উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন।
দুই দেশের স্বার্থেই সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা জরুরি
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি দুই দেশের পারস্পরিক প্রয়োজনও রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সরবরাহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভারতবিরোধী শক্তির তৎপরতা ঠেকাতে বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন দিল্লির।
এ ছাড়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিও দুই দেশের সামনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এসব কারণে বর্তমান অস্বস্তির মধ্যেও একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজছে উভয় পক্ষ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের বিশেষ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণও রয়েছে।
তবে ২১ থেকে ২৫ আগস্টের সম্ভাব্য সফর এখনো চূড়ান্ত হয়নি। হাসিনা ইস্যুসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তার ওপরই সফরটির অগ্রগতি অনেকটা নির্ভর করছে।
সময়ের আলো/জেডি